বর্তমানে আমাদের যুবক সমাজের মাঝে বার্নিং কোয়েশ্চেনগুলোর একটি ফ্রিল্যান্সিং কি ( what is Freelancing ) আমি ফ্রিল্যান্সিং কিভাবে করবো? কোন কাজ জানলে ফ্রীল্যান্সিং করা যায়। ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে আসলে অনেক প্রশ্নই জমে আছে আমাদের যুবক সমাজের মাঝে। ফ্রিল্যান্স ও ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে আলোচনার পূর্বে চলুন ২টা গল্প  শুনে আসি।

গল্প-১ : আসিফ গ্রামের ছেলে। বাবা কৃষক হলেও বহু কষ্টে ছেলেকে বিবিএ পাশ করিয়েছেন। আসিফ ক্লাস টেন থেকেই টিউশনি করতো। বাবারথেকে খরচ চাইতে আসিফের খুবই খারাপ লাগতো। প্রায়ই ভাবতো নিজে নিজে কিছু করার।

তবে অন্যের উপর নির্ভর থেকে কোনো কাজ করতে আসিফের ইচ্ছা করে না। আসিফ ভাবে এমন একটা সুযোগ যদি থাকতো যেখানে আসিফ যতটুকু সময় দিবে ঠিক ততটুকুই আয় করতে পারবে। ধরাবাধা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার কাজ করতে আসিফ একদমই বিশ্বাসী না।

গল্প-২ : মিলন সাহেব একজন ব্যাংকার। ব্যাংকে প্রতিদিন সকাল ৮টার মধ্যে উপস্থিত থাকতে হয়। একটু দেড়ি হলেই অনুপস্থিত ধরা হয় তাকে। ব্যাংকের কাজ শেষ করতে করতে বিকাল ৫টা পেড়িয়ে যায়।

কখনো কখনো কাজের চাপ খুব বেশী থাকলে মিলন সাহেবকে কাজ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। আর ম্যানেজার বা উর্ধত্বন কর্মকর্তার বকাঝকা তো আছেই। তবে এমনও কিছু সময় থাকে যখন মিলন সাহেবের কোনো কাজ থাকে না। তবুও তাকে ব্যাংকেই অবস্থান করতে হয়।

অসিফ ও মিলনের গল্প গুলো একই সূত্রে গাঁথা। আসিফের অপছন্দে মিলন সাহেব ভুগছেন এবং মিলন সাহেবের চাওয়াটাই আসিফের পছন্দ। কোনো মানুষই চায় না কারো অধীনে কাজ করতে। তবুও আমরা বাধ্য থাকি কারো না কারো অধীনে কাজ করার।

তবে যদি ব্যাপারটা এমন হতো যে কারো অধীনে কাজ করবো ঠিকই তবে কতটুকু করবো আর কিভাবে করবো তা সম্পূর্ণই আমার উপর নির্ভর করবে তবে কেমন হবে ব্যাপারটা? স্বপ্ন মনে হয়? স্বপ্ন না এটাই বাস্তব। একুশ শতাব্দীতে এসেও অবাস্তব শব্দের প্রয়োগ করা নিছক বোকামি।

❐ তবে কিভাবে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিবো?

ঠিক আসিফ আর মিলন সাহেব যেই ধারণা পোষণ করছেন এটাই মূলত “ফ্রিল্যান্সিং”। ফ্রিল্যান্সিং শব্দটা ছোট হলেও বর্তমান এই ছোট শব্দটিই বহু তরুণ – তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্লাস সিক্সে থাকতে পড়েছিলাম “আত্মকর্মসংস্থান” নিয়ে।

অর্থাৎ নিজেই কাজের সৃষ্টি করা। ফ্রিল্যান্সিংয়ে মূলত নিজেই নিজের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার এক চমৎকার মাধ্যম। আপনি কোনো ব্যাপারে অভিজ্ঞ থাকলে নিজের অভিজ্ঞতা বা পছন্দকে পেশাতে রূপ দিয়ে ফেলুন।

কাজটা যাই হোক না কেনো, শুধু একটু চেষ্টা আর ধৈর্য্যই পারে আপানাকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে উন্নতির চরম শিখড়ে পৌছে যেতে।

❐ ফ্রিল্যান্সিং কি ( what is Freelancing )?

ফ্রিল্যান্সিং এর কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই, তবে ফ্রিল্যান্সিকে একটু বুঝিয়ে বলা যায়। ধরুন আপনাকে বলা হলো একটা আম বাগান থেকে ১০০টা ভালো ও সুন্দর আম সংগ্রহ করতে এবং সময় বেঁধে দেওয়া হইলো ৩০ মিনিট।

এই অল্প সময়ে দ্রুত আম গাছ থেকে আম সংগ্রহ করা দুস্কর তবে এই কাজটির জন্য আপনাকে ভালো একটা এমাউন্ট পেমেন্ট করা হবে। তো আপনার কাছে শর্ত গুলো হলো :

১. ভালো আম

২. ১০০ টি আম

৩. সময় ৩০ মিনিট

এই ৩টা শর্ত আপনার একার পক্ষে মেনে কাজ করা কঠিন। তো আপনি যদি এই অল্প সময়েই সবগুলো শর্ত মেনে কাজগুলো করতে চান তবে এর জন্য আপনার প্রয়োজন বেশী সংখ্যক মানুষ। কারণ শর্তে কোথাও লেখা নেই আপনাকে একাই আম তুলতে হবে।

তো আপনি ১০ জন লোক নিয়োগ করলেন এই কাজটির জন্য এবং বিনিময়ে তাদের জন্য কিছু অর্থও বরাদ্দ করলেন। দেখা গেলো ঠিক সবগুলো শর্ত আপনি ঠিক ঠাক পূরণ করতে পেরেছেন। মূলত এটাই হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং।

এক কথায় “নিজের কোনো একটি কাজ অন্যকে দিয়ে করানো এবং বিনিময়ে অর্থ প্রদান অথবা অন্যের কোনো কাজ করে দেওয়ার বিনিময়ে কিছু অর্থ উপার্জনকেই সাবলীল ভাষায় ফ্রিল্যান্সিং ( freelancing ) বলে”।

❐ ফ্রিল্যান্সার কিভাবে হবো?

ফ্রিল্যান্সিং করতে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ যেই তিনটি জিনিস প্রয়োজন তা হলো একজন ফ্রিল্যান্সারের সময়, ধৈর্য্য এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে দক্ষতা। ফ্রিল্যান্সার হতে হলে অবশ্যই আপনাকে এইদিকে বেশী সময় দিতে হবে। ধৈর্য্য ছেড়ে দিবেন তো হেরে যাবেন। এছাড়াও আপনাকে বেশ কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে।

যদি আপনি ভিডিও এডিটিং বা মাইক্রোসফট এক্সেল বা যে কোনো কাজ হোক তা টাইপিং, সাউন্ড মিক্সিং, ডিজাইনিং যাই হোক না কেনো তা আপনাকে মোটামুটি আয়ত্বে রাখতে হবে বা ঐ বিষয়ে জ্ঞান থাকতে হবে। কম্পিউটারসহ অন্যান্য টুলস তো আপনাকে সাথে রাখতেই হবে।

❐ ফ্রিল্যান্সিং সাইটে কি ধরনের কাজ করা যায়?

ফ্রিল্যান্সিং সাইটগওলোতে আপনি একটি ফেসবুক কভার পেজ কিংবা কোন ইভেন্ট ব্যানার পেজ বানিয়েও আয় করতে পারবেন। ছোট ছোট কাজ যেগুলো আপনি শখের জন্য করে থাকেন, এমন কাজ করেও ফাইভার থেকে আয় করা সম্ভব।

এমনকি ছবি ইডিট করে, কিংবা ছবি তুলেও আপনি আয় করতে পারেন। এছাড়া দেখে দেখে লিখে অর্থাৎ রি-রাইট করেও আয় করা যায় ( অনেকের পিডিএফ ফাইলকে ওয়ার্ড  এ নেওয়ার দরকার হয় )। এমন হাজারো সহজ কাজ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে ফ্রিল্যান্সিং সাইটগওলোতে।

❐ Freelancing sites job category

  1. Graphics & Design
  2. Web Developement
  3. Digital Marketing
  4. Content Writing & Translation
  5. Video & Animation
  6. Music & Audio
  7. Programming & Tech
  8. Business
  9. Lifestyle
  10. Industries, etc

প্রত্যেকটি ক্যাটাগরিতে আবার ১০০+ সাব-ক্যাটাগরি রয়েছে। আপনার দক্ষতা রয়েছে, এমন কাজ অবশ্যই আপনি ফাইভারে পেয়ে যাবেন।

❐ ফ্রিল্যান্সিং সাইট ( Freelancing sites )

ফ্রিল্যান্সিং জব গ্লোবাল ভিলেজ থিউরিকে বাস্তব করে তুলেছে। সারা পৃথিবীর ক্রেতা-বিক্রেতাকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছে। ক্রেতা-বিক্রেতাকে এক করে দিতে অনেক মধ্যস্ততাকারী সাইট রয়েছে। তবে ফ্রিল্যান্সারদের কাছে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় সাইটগুলো হচ্ছে Freelancer, Upwork, Fiverr, Microworker

Fiverr এ দ্রুত কাজ কাজ পাওয়া যায়, ৫-১০ ডলারের ছোট ছোট কাজ পাওয়ার জন্য ফাইবার এবং মাইক্রোওয়ার্কার এ কাজ শুরু করতে পারেন। এই সাইটের জন্য আপনার ওয়েব ডেভলপমেন্ট এর মতো কঠিন কাজ না জানলেও আয় করার সুযোগ রয়েছে। একটি ইংরেজি আর্টিকেল লিখেও ১০ থেকে ৩০০ ডলার বা তারও বেশি আয় করা সম্ভব।

❐ ফ্রিল্যান্সিংয়ের সুবিধা কি ( what are the benefis of freelancing )?

যদি আপনি একজন ফ্রিল্যান্সার হন তবে আপনি বেশ কিছু সুবিধা পেতে চলেছেন বা পাচ্ছেন যা অন্য সব পেশাজীবীরা পায় না।

  •  ফ্রিল্যান্সিং যেহেতু এক ধরনের মুক্ত পেশা তাই আপনাকে কারো কাছে কাজের জন্য জবাবদিহিতা করতে হবে না।
  •  একজন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আপনি আপনার পছন্দের যে কোনো কাজকে প্রাধান্য দিতে পারেন।
  •  আপনি আপনার বাসায় বা যে কোনো জায়গায় বসেই ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করতে পারেন।

❐ ফ্রিল্যান্সিংয়ের অসুবিধা কি ( what aredisadvantages of freelancing )?

সব কাজেই সুবিধা এবং অসুবিধা দুটোই থাকে। ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজও এর থেকে ভিন্ন নয়। যেহেতু আপনাকে কোনো অফিসে যেয়ে কাজ করতে হয় না তাই কিছু মানুষ ফ্রিল্যান্সিংকে ছোট করে দেখেন।

তাছাড়া আমাদের দেশে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটাই সমস্যা দেখা দেয় এবং সেটা হচ্ছে পেমেন্ট। সাধারণত পেপাল, ভিসা, মাস্টার কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট রিসিভ করতে হয় এবং এটি তুলনামূলক একটু বেশী ঝামেলার। তবে খুব শীঘ্রই সরকার এই সমস্যা থেকে উত্তরণ করার চেষ্টা করছে।

শেষ কথা :

আমাদের উপরের আলোচনা থেকে আমরা জানলাম ফ্রিল্যান্সিং কি, কিভাবে একজন ফ্রিল্যান্সার হওেয়া যায় কিভাবে ফ্রিল্যান্সিং করা যায় এবং আরো জেনেছি ফ্রিল্যান্সিং পেশায় সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে।

ফ্রিল্যান্সিং ( freelancing ) পেশায় যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আমাদের দেশের বহু বেকার তরুণ তরুণী আজ ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে। আশা করা যায় এই ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নত দেশের মতোই এগিয়ে যেতে পারবে।


Shakib Ahmed

আমি সাকিব আহমেদ। অবসর সময়ে PRATIBORTON এ লেখালেখি করি।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।