নতুন মোবাইল কেনার আগে : বর্তমান সময়ে যোগাযোগের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম হচ্ছে মোবাইল ফোন। একটি মোবাইল ফোন দিয়ে আপনি শুধু যে সফল যোগাযোগই করতে পারবেন তা নয়, আপনি খুব দ্রুত ও সহজে সারা পৃথিবীর খোঁজ রাখতে পারবেন, হাজারো জিনিস শিখতে পারবেন। সময়ের সাথে সাথে যোগাযোগের এই শ্রেষ্ঠ মাধ্যমে নানা পরিবর্তন এসেছে।

এখন এই একবিংশ শতাব্দীতে সকলের হাতে ধরা দিয়েছে “স্মার্টফোন”। সময়ের সাথে চলতে আপনাকেও একটি স্মার্টফোন অবশ্যই কিনতে হবে। নতুন মোবাইল ফোন কেনার আগে অবশ্যই আপনাকে কিছু বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। প্রশ্ন থাকতে পারে “কেন ধারণা থাকতে হবে?” উত্তরটি দিচ্ছি নিচের আলোচনাতে।

নতুন মোবাইল ফোন কেনার আগে কেনো ধারণা নিতে হবে?

সময় পরিবর্তনশীল। আমরা এখন যেই সময়ে আছি তা বহু শতাব্দী পেরিয়ে তারপর বর্তমানরূপে পেয়েছি। পায়ে হেটে, গরুর গাড়িতে করে, ঘোড়ার গাড়ি হয়ে, টিউবের চাকায় করে, মেশিনের গাড়িতে চেপে এখন আমরা উড়োজাহাজ পেয়েছি।

এখন উড়োজাহাজের এই শহরে আপনি যদি গরুর গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন তাতে কি আপনার কোনো উপকার হবে? তাছাড়া কোনো ট্রাফিক পুলিশও আপনাকে রাস্তায় গরুর গাড়ী নিয়েই নেমে পড়তে দিবো না। ঠিকই একই ঘটনা ঘটবে আপনার ফোনের জন্যও।

আপনি ফোন কিনতে গেলে যদি পুরোনো ফিচারের ফোন কিনে ফেলেন তবে আপনার সুবিধার থেকে অসুবিধাটাই বেশী হবে। বেশী দামী ফোন কিনলেই যে আপনি তাতে আপনার সব প্রয়োজন মেটাতে পারবেন ব্যাপারটা ঠিক এমন নয়।

আপনার যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুর হিসেব করলেই তা আপনার জন্য যথেষ্ট হবে। মনে রাখবেন, প্রয়োজন অল্প তবে আপনি বেশী খরচা করে প্রয়োজনের তুলনায় বেশী সুবিধা জমিয়ে রাখলেন – এটাও এক ধরনের অপচয়ই।

❐ নতুন কোন ফোন কিনবো?

বর্তমানে বিশ্বে ১২০টির মতন ব্রান্ড আছে যারা ফোন তৈরী করেন। প্রতিটি ব্রান্ডের যদি ১০০ টি করেও মডেল থাকে তবে ১২০০০ ফোন আছে ব্রান্ডেড। এই ১২০০০ ফোন থেকে আপনাকে বেছে নিতে হবে যেকোনো একটি। অঞ্চলভিত্তিক কিছু নন ব্রান্ড বা ডাউনগ্রেডের ব্রান্ড আছে যা এই সংখ্যায় যুক্ত করা হয়নি।

এখন হয়তো বিষয়টা কঠিন লাগবে যে এত এত ব্রান্ড থাকলে আমি কোন ফোনটা কিনবো। উত্তরটা নিছকই ছোট। একটা ব্রান্ডকে আপনি ফলো করুন। তাদের সার্ভিস সম্পর্কে অবহিত হোন। ভালো ব্রান্ড, ভালো সার্ভিস। সিম্পল। “আমরা যেহেতু কোনো ব্রান্ডকে প্রমোট করছি না বিধায় কোন নির্দিষ্ট ব্রান্ডের নাম বলা হচ্ছে না”।

❐ নতুন মেবাইল ফোন কেনার আগে কি কি বিষয় ভাবতে হবে?

আপনি আজ ফোন কিনবেন, বাসা থাকা টাকা নিয়ে গেলেন দোকানে। সেলসম্যান আপনাকে অভ্যর্থনা দিলেন। জিজ্ঞেস করলো, “স্যার কি ফোন কিনবেন” আপনি জবাবে বলে দিলেন যেকোনো একটা ভালো ফোন। আপনাকে পুনরায় প্রশ্ন করা হলো, “আপনার বাজেট কতো?” আপনি এমাউন্ট বলে দিলন।

অতঃপর আপনাকে ফোন দেখানো শুরু হলো এবং আপনাকে দেখানো প্রথম ফোনটাই আপনার পছন্দ হয়ে গেলো। বাসায় নিয়ে আসলেন। ২ দিন ব্যবহার করার পর দেখলেন ব্যাটারি ব্যাকআপ খুবই কম।

এখন আপনি একজন চাকুরীজীবী মানুষ, সারাদিন ব্যাকআপ না পাওয়ায় আপনার জন্য খুব সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। ক্যামেরাটা মুখ্য না আপনার কাছে। ঠিক এইরকম ভোগান্তি পোহাতে না হলে অবশ্যই আপনাকে বুঝতে হবে আপনার কি কি প্রয়োজন। প্রথমেই দেখবেন,

❐ ফোন বডি প্লাস্টিক নাকি মেটাল

অবশ্যই প্লাস্টিকের থেকে মেটাল ফোনগুলো একটু বেশী ভালো হয়। এতে আপনার ফোন হাত থেকে পড়ে গেলেও কিছুটা সুরক্ষা পায়। তবে সম্পূর্ণ মেটাল ফোন এখন আর তেমন তৈরী হয় না। তবুও ফ্লাগশিপ ফোন গুলো মেটাল বডির হয়। এছাড়া অ্যাপল ব্রান্ডের সকল ফোনই মেটাল বডির হয়ে থাকে।

❐ মোবাইলের স্ক্রিন সাইজ এবং ডিসপ্লে

নতুন স্মার্টফোন

আপনার ফোনের ডিসপ্লে সাধারণত কতটুকু হবে তা নির্ভর করবে আপনার উপর। আপনি যদি মুভি বা ভিডিও দেখতে বা গেইম খেলতে বেশী পছন্দ করেন তবে আপনার বড় স্ক্রিন প্রয়োজন, সেক্ষেত্রে ৬ ইঞ্চি স্ক্রিনের ফোনগুলো আপনার জন্য পারফেক্ট।

মোবাইলে গেম খেলা বা মুভি দেখার প্রয়োজনীয়তা না থাকলে ছোট স্ক্রিনের ফোন কিনুন, ৪.৭ ইঞ্চি থেকে ৫.২ ইঞ্চি ডিসপ্লের ফোনের লুক এবং ব্যবহার করে স্বস্তি পাবেন।

মোবাইলে বিভিন্ন ধরনের ডিসপ্লে ব্যবহার করা হয় যেমন WVGA, HD, HD+, Full HD । আপনার ফোন ভিডিও দেখার জন্য কিংবা গেম খেলার জন্য হেলে অবশ্যই Full HD নেওয়ার চেষ্টা করবেন, ভাল কোয়ালিটি এবং প্রিমিয়াম কোয়ালিটির জন্য কমপক্ষে HD+ নিতে হবে।

এছাড়াও আপনার ফোনের ডিসপ্লে যেন কমপক্ষে IPS LCD বা তার চেয়ে ভাল হয় সেদিকে নজর রাখবেন। এর চেয়ে কম হলে ডিসপ্লেতে খসখসে ভাব আসবে, ঘেমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিবে।

স্ক্রিণ রেজ্যুলেশন আরো একটি গুরুত্বপূল বিষয়। HD কোয়ালিটির ভিডিও দেখার জন্য কমপক্ষে ৭২০ পিক্সেল বাই ১৫২০ পিক্সেল রেজ্যুলেশন সম্বলিত ফোন নিতে হবে।

❐ ফোনের ROM ও RAM

ফোনের RAM অবশ্যই যাচাই করবেন। বর্তমানে সব ফোনের কমবেশী ROM টা ৩২ জিবি থেকে ১২৮ জিবির হয়ে থাকে। তবে RAM এর ক্ষেত্রে আপনাকে সচেতন হতে হবে।

ভাল ব্রান্ডের ৪ জিবি RAM এর ফোনগুলোও আপনার জন্য যথেষ্ট হবে। যদি আপনি হালকা ইউজ করতে পছন্দ করেন তবে ২/৩ জিবি RAM এর ফোনও আপনি ব্যবহার করতে পারবেন।

মোবাইলের RAM  কম হলে কিছুদিন পরেই হ্যাং করা শুরু করতে পারে। RAM বেশি হলে স্মার্টফোন smoot এবং ফাস্ট হবে। কমদামী ব্রান্ডগুলোতে অনেক র‌্যাম দিলেও বেশিরভাগ স্টোরেজ বিল্ট ইন অ্যাপস দিয়ে ভরে দেয়, তাই ফোন কেনার সময় দেখে নিন usable RAM  কতটুকু রয়েছে।

RAM এবং ROM এর কম্বিনেশন ভাল হতে হবে। আপনি যদি ১২৮ জিবি স্টোরেজ এর ফোনে ৪ জিবি র‌্যাম নেন তাহলে মোবাইল স্লো হয়ে যাবে।

১২৮ জিবির সাথে অবশ্যই ৮ জিবি র‌্যাম নিতে হবে। আবার ৩২জিবি ফোন স্টোরেজের সাথেও ৬ জিবি বা ৮ জিবি র‌্যাম আপনাকে সুবিধা দিতে পারবেনা।

বর্তমানে বেশিরভাগ ফোনে বিভিন্ন ধরনের স্টোরেজ ক্যাপাসিটির সুবিধা বেশি দেওয়া হচ্ছে। আপনার প্রয়োজনীয় স্টোরেজযুক্ত ফোন কেনার চেষ্টা করুন যেন অতিরিক্ত এসডি কার্ডের প্রয়োজন না হয়।

❐ ফোনের প্রসেসর

প্রসেসরটি মূলত RAM এর সাথে জড়িত। নতুন স্মার্টফোন গুলোর প্রসেসর RAM এর সাথে মিল রেখে দেওয়া হয়। এই বিষয়ে ভালো প্রসেসরওয়ালা ফোন পেলে আপনার ফোন স্লো বা ল্যাগিং না করার সম্ভাবনা বেশী। মোবাইলের speed মোবাইলের  Ram  এর পাশাপাশি processor এবং মোবাইলের core speed এর উপরও নির্ভর করে।

একটি ভাল এবং ফাস্ট ফোনের জন্য কমপক্ষে Octa core processor ও processor speed কমপক্ষে ১.৫GHz হতে হবে। ভাল হয় যদি 2GHz  এর অধিক স্পিড হয়।

Quad core processor কিংবা ডুয়াল কোর প্রসেসর এর কোন ফোন কিনলে খুব দ্রত ফোন হ্যাং এবং লো স্পিড সমস্যা দেখতে পারবেন এবং ভারী কোন কাজের জন্য ব্যবহার করতে পারবেন না।

❐ স্মার্টফোনের ক্যামেরা

ক্যামেরা আপনার ফোনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যেই রকম ইউজারই হন না কেনো ক্যামেরার প্রয়োজন কম বেশী আপনার আছেই। তাই নতুন স্মার্টফোন কেনার আগে ক্যামেরা কোয়ালিটিও দেখা উচিৎ।

আপনার সেলফি ক্যামেরা ৫/৮ মেগাপিক্সেল হলেই যথেষ্ট এবং রিয়ার ক্যামেরা ১৩ মেগাপিক্সেল হলেও হবে। যারা ফটোগ্রাফি পছন্দ করেন তাদের জন্য এখানে মেগাপিক্সাল এবং Aperture দুটোরই তারতম্য হবে।

আমাদের অনেকের ভুল ধারণা রয়েছে, যে মেগাপিক্সেল বেশি হলেই ছবি ভাল হয়, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। মেগাপিক্সেল যতো বেশি হবে, আপনার ছবির সাইজ ততো বড় হবে। ক্যামেরা কোয়ালিটি তার সেন্সর, Aperture, এবং ফোকাসের উপর নির্ভর করে।

❐ স্পিকার :

ফোন কেনার ক্ষেত্রে অন্তত একবার হলেও স্পিকারটি বাজিয়ে নিবেন। বর্তমানে যেভাবে আমরা অনলাইন নির্ভর হয়ে পড়েছি, সব কনফারেন্স, মিটিং, ক্লাসই অনলাইনে হচ্ছে, তাছাড়া পডকাস্ট এর জন্যও মোবাইলে একটি ভাল স্পিকার প্রয়োজন। আপনার যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু না পেলে অন্য মডেল গ্রহণ করবেন।

❐ ফোনের ব্যাটারী ব্যাকআপ :

ফোন-ব্যাটারী

সম্ভবত কোন কাস্টমারই জেনেশুনে কম ব্যাকআপ সম্বলিত ফোন কিনতে চাইবেন না। তবে ব্যবহারের উপর ব্যাটারী ক্যাপাসিটি বেশি করা যায়।

একজন গেমারের যে পরিমাণ ব্যাকআপ দরকার, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর কিন্তু সেই পরিমাণ নেই অথবা যিনি কিনা শুধু ছোট ছোট কাজ, কল করা বা মেসেজ করার কাজে ফোন ব্যবহার করেন তারও সম পরিমাণ ব্যাটারী প্রয়োজন নেই।

একটি ফোনের ব্যাটারী ব্যাকআপের সাথে ফোনের সাইজ, ওজন এবং স্টাইল ডিপেন্ড করে। অপ্রয়োজনে অধিক ব্যাকআপ নিয়ে  ফোন স্টাইলের সাথে কম্প্রোমাইজ করার কোন মানে হয় না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যাটারী ব্যাকআপযুক্ত ফোন নেওয়াও জরুরী।

একজন হেভি ইউজারের জন্য ৪০০০mAh+ ব্যাটারী প্রয়োজন, যা ১৬-১৮ ঘন্টা ব্যাকআপ দিতে পারবে। আবার একজন নরমাল ব্যবহারকারীর জন্য ২৫০০mAh ব্যাটারীও ১৫-১৬ ঘন্টা পাওয়ার ব্যাকআপ দিবে।

ব্যাটারী নিয়ে চিন্তা করার আগে ঠিক করুন আপনি কি ধরনের মোবাইল ইউজার, নতুন কেনা মোবাইলটি কি কাজে বেশি ব্যবহৃত হবে।

❐ আফটার সেল সার্ভিস :

সব ব্রান্ডের সার্ভিসই এক রকম নয়। তবে যে ব্রান্ডের সার্ভিস সেন্টার আপনার নিকটেই রয়েছে আছে, সেই ব্রান্ডের ফোন ক্রয় করা আপনার জন্য ভালো হবে।

শেষ কথা :

পরিশেষে আপনাকে নতুন ফেনার কেনার প্রস্তুতির জন্য শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। নতুন মোবাইল ফোন কেনার আগে অবশ্যই উপরের পয়েন্টগুলো পরীক্ষা করে নিবেন।

আপনার বাজেট যতটুকু হবে ততটুকুর মধ্যেই ফোন নিবেন। মনে রাখবেন ফোন কিনছেন কথা বলার জন্য এবং দৈনন্দিন কাজকে সহজ করার জন্য, লোক দেখানোর জন্য নয়।


Shakib Ahmed

আমি সাকিব আহমেদ। অবসর সময়ে PRATIBORTON এ লেখালেখি করি।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

three × 2 =

error: Content is protected !!