থাইরয়েড কি? থাইরয়েড কমানোর উপায়

থাইরয়েডের সমস্যা থাইরয়েড কী

থাইরয়েড বর্তমান বিশ্বে বহুল আলোচ্য একটি বিষয়। আমাদের অধিকাংশেরই একটি ভুল ধারণা হচ্ছে, থাইরয়েডের সমস্যা নিশ্চয়ই কোন জটিল একটি রোগের নাম। আমরা নিত্যদিনই এই ভুল ধারণাটি নিয়ে চলছি ফিরছি, কিন্তু কেউই জানতে চেষ্টা করছি না যে থাইরয়েড কি, আসলে ভুলটি ঠিক কোথায়, থাইরয়েড কমানোর উপায় আছে কি না!

যে কারণে অধিকাংশ মানুষই আঁতকে উঠছে শুধুমাত্র থাইরয়েডের নাম শুনেই। থাইরয়েড সমস্যার আদ্যেপান্ত জানতে হলে প্রথমে আমাদের দরকার শরীরতত্ত্ব সম্পর্কে একটুখানি জ্ঞান। আমরা আজকের আলোচনায় থাইরয়েড কি, থাইরয়েড সমস্যার কারণ এবং থাইরয়েড কমানোর উপায় নিয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো ইন-শা-আল্লাহ।

থাইরয়েড কি | What is Thyroid in Bengali

আমাদের দেহের অভ্যন্তরে অসংখ্য গ্ল্যান্ড (gland) বা গ্রন্থির বসবাস, যাদের মাঝে থাইরয়েড (Thyroid) অন্যতম। থাইরয়েড গ্রন্থি গলার সম্মুখভাগে অবস্থিত, শ্বাসনালী বা ট্রাকিয়ার (trachea) চতুর্দিকে বেষ্টিত।

আকৃতিতে ছোট এই গ্রন্থিটি প্রজাপতি-সদৃশ, এবং এর প্রশস্ত ডানা দুটো গলার চারপাশে প্রসারিত। সুতরাং থাইরয়েড কোন রোগের নাম নয়, বরং শরীরের অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি অঙ্গ বা গ্রন্থির নাম।

থাইরয়েড রোগের প্রকারভেদ

থাইরয়েড সংক্রান্ত রোগ দুই ধরণের হয়ে থাকে।

  1. হাইপোথাইরয়েডিজম (hypothyroidism)
  2. হাইপারথাইরয়েডিজম (hyperthyroidism)

থাইরয়েড গ্রন্থির কাজ

দেহের অন্যান্য গ্রন্থির মত থাইরয়েডও হরমোন তৈরি, নিঃসরণ ও নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এসকল হরমোন আমাদের দেহের মেটাবলিজম (Metabolism) বা বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

যারা মেটাবলিজম সম্পর্কে জানেন না তাদের জন্য বলছি, মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়া হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে আমাদের দেহের অভ্যন্তরে খাদ্যকণা ভেঙে শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

এই এনার্জি বা শক্তির কাজই হচ্ছে আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ সকল কাজকর্মের নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করা। সুতরাং মেটাবলিজম আমাদের সুস্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণে কতখানি জরুরি তা একবার ভেবে দেখুন।

থাইরয়েড গ্রন্থি নিঃসৃত হরমোনের কাজ

থাইরয়েড গ্রন্থি মূলত দুই ধরণের হরমোন নিঃসরণ করে-

  1. ট্রায়োডোথাইরোনিন (triiodothyronine) বা সংক্ষেপে T3 এবং
  2. থাইরক্সিন (thyroxine) বা সংক্ষেপে T4

ট্রায়োডোথাইরোনিন হরমোনটি তিনটি আয়োডাইড পরমাণু দ্বারা এবং থাইরক্সিন হরমোনটি চারটি আয়োডাইড পরমাণু দ্বারা গঠিত।

এই দুটো হরমোনের প্রথম কাজ খাদ্যকণাকে শক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়ার সঠিক পরিচালনা করা। দ্বিতীয়ত, এরা শরীরের প্রতিটি কোষে এই সিগন্যাল পৌছে দেয় যে ঠিক কতখানি শক্তি খরচ হচ্ছে কিংবা কতখানি খরচ হওয়া দরকার।

ট্রায়োডোথাইরোনিন ও থাইরক্সিন ছাড়াও থাইরয়েড হরমোন ক্যালসাইটোনিন (calcitonin) নামক আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিঃসৃত করে, যা দেহাভ্যন্তরে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত রাখে।

থাইরয়েড মূলত তখনই ঠিকমতো কাজ করে, যখন এর নিঃসরিত হরমোনগুলো পুরো দেহজুড়ে বিপাকক্রিয়ার হার ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

এই থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যক্রম কিন্তু আবার আরেকটি বিশেষ গ্রন্থির তত্ত্বাবধানের আওতায় পড়ে, যার নাম পিটুইটারি গ্রন্থি (Pituitary Glands)।

মানবদেহের খুলির মধ্যভাগে মস্তিষ্কের নিচে অবস্থিত এই ক্ষুদ্রাকৃতির গ্রন্থিটি অন্যান্য সকল গ্রন্থির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে বলে একে মুখ্য গ্রন্থি বা Master Gland ও বলা হয়ে থাকে।

পিটুইটারি গ্রন্থির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো থাইরয়েড হরমোনের বৃদ্ধি বা হ্রাসের হার পরিমাপ এবং নিয়ন্ত্রণ করা। যখন আমাদের রক্তপ্রবাহে থাইরয়েড হরমোনগুলোর নিঃসরণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় বা হ্রাস পায়, তখন পিটুইটারি গ্রন্থি তার নিজস্ব নিঃসৃত হরমোন দ্বারা এই অসামঞ্জস্যতাকে সমন্বয় করে।

এই উল্লেখযোগ্য হরমোনটির নাম থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (thyroid stimulating hormone) বা সংক্ষেপে টিএসএইচ (TSH)।

এই হরমোনটি থাইরয়েড গ্রন্থির কাছে এই বার্তা পৌছে দেয় যে কীভাবে কি করলে আমাদের দেহে আবারো ট্রায়োডোথাইরোনিন ও থাইরক্সিনের সঠিক অনুপাত বজায় থাকবে এবং আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে।

এছাড়াও শরীরে আয়োডিনের মাত্রা ঠিক রাখা এবং থাইরয়েড গ্রন্থির আকৃতি বৃদ্ধি বা হ্রাস পাচ্ছে কিনা সে ব্যাপারটিও নিয়ন্ত্রণ করে এই হরমোনটি। কখনো যদি দেহে থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোনের নিঃসরণ কম হয়, তাহলে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যক্ষমতাও ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে।

থাইরয়েডের সমস্যা কেন হয়?

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, থাইরয়েড সংক্রান্ত রোগ তখনই হয় যখন থাইরয়েড গ্রন্থি আমাদের দেহের সুস্থতার জন্য সঠিক অনুপাতে থাইরয়েড হরমোনগুলো নিঃসরণে অক্ষম হয়ে পড়ে।

ফলশ্রুতিতে আমাদের পুরো শরীরজুড়েই একধরণের নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। ঠিক এই অবস্থাটিকেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় থাইরয়েড ডিজিজ (Thyroid disease) বলা হয়ে থাকে।

থাইরয়েডজনিত রোগ কাদের হয়?

১। থাইরয়েড সংক্রান্ত রোগে বয়স কোন বিষয় নয়। নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোর-কিশোরী, বয়স্কসহ যে কেউই এতে আক্রান্ত হতে পারেন।

তবে পুরুষদের তুলনায় নারীদের এতে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেশি। এমনকি অনাগত শিশুরও এটি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যদি তার মা হাইপোথাইরয়েডিজমের রোগী হয়ে থাকেন। একজন ষাটোর্ধ্ব বয়সের নারীর ক্ষেত্রে থাইরয়েডের রোগে আক্রান্ত হওয়া একটি সাধারণ চিত্র।

২। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরিপ থেকে জানা যায় যে, একজন পুরুষের তুলনায় একজন নারীর কমপক্ষে পাঁচ থেকে আটগুণ বেশি থাইরয়েডের রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি রয়েছে।

বিশেষ করে মেনোপজের পরে একজন নারীর দেহে থাইরয়েড হরমোনের অসামঞ্জস্যতা শনাক্ত হবার সম্ভাবনা খুব বেশি।

৩। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থাইরয়েডের রোগ বংশগত হয়ে থাকে। অর্থাৎ একই পরিবারের কোন সদস্য এতে আক্রান্ত হলে বাকিদের ক্ষেত্রেও একটি ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

৪। যেসব রোগীরা তাদের জীবদ্দশায় আগেই থাইরয়েড গ্রন্থির ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রেও থাইরয়েডের রোগ পুনরায় হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

কোন কোন থাইরয়েডের রোগী দুর্ভাগ্যবশত থাইরয়েড গ্রন্থির ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তাদের ক্ষেত্রে সার্জনদের থাইরয়েডেক্টমি (thyroidectomy) নামক সার্জারির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

এছাড়াও হাইপোথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থির বড়সড় জটিলতা দেখা দিলেও এই সার্জারির প্রয়োজন হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে রোগীকে উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন বা কেমোথেরাপি দেয়া হয়।

এই সার্জারির রেডিয়েশনই মূলত রোগীর ক্ষেত্রে পুনরায় থাইরয়েডের রোগে আক্রান্ত হবার অন্যতম আরেকটি কারণ।

৫। এছাড়াও টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত রক্তস্বল্পতা (pernicious anemia), গেঁটেবাত বা রিউম্যাটোয়েড আর্থ্রাইটিস (rheumatoid arthritis), টার্নার সিনড্রোম (Turner syndrome) সহ ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের থাইরয়েড হবার ঝুঁকি রয়েছে।

থাইরয়েড ঝুঁকি কমানোর উপায়

  • আয়োডিন সমৃদ্ধ কিছু ঔষধ থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকা (যেমন কফ সিরাপ, মাল্টিভিটামিন সাপ্লিমেন্ট ইত্যাদি)।
  • ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করা।
  • নিয়মিত শারীরিক চর্চা করা (যোগব্যায়াম, এক্সারসাইজিং, হাঁটা ইত্যাদি)।
  • নিজের সম্পর্কে ও পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করা, মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা।

থাইরয়েড নিয়ে শেষ কথা

থাইরয়েড কি জানলেন তো! একটি সুস্থ সবল জীবন ধরে রাখার জন্য স্বাস্থ্যের সঠিক পরিচর্যার কোন বিকল্প নেই। তাই থাইরয়েড বা থাইরয়েডের সমস্যা সংক্রান্ত রোগের নাম শুনে আঁতকে না উঠে সচেতন হোন। কেননা একটি সুস্থ জীবন সকলের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!