অনলাইনে আর্টিকেল লিখে আয় করার অনেকগুলো পদ্ধতি আছে। এর মধ্যে কপিরাইটিং ( Copywriting ) বেশ জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। কন্টেন্ট রাইটিং ( content writing ) নিয়ে মোটামুটি অনেকের ধারণা থাকলেও কপিরাইটিং কি তা নিয়ে খুব বেশি মানুষ ধারণা রাখেন না।

ডিজিটাল মার্কেটিং এর একটা বড় অংশ জুড়ে আছে কপিরাইটিং। আজকে আলোচনা করবো কপিরাইটিং কি, কন্টেন্ট রাইটিং ও কপিরাইটিং এর মধ্যে পার্থক্য এবং কপিরাইটিং করে আয় করার বিভিন্নি উপায় ও খুঁটিনাটি দিক নিয়ে নিয়ে।

কপিরাইটিং কি ( What is Copywriting in Bangla )?

নাম শুনেই মনে হতে পারে এটি বুঝি কপিরাইট আইন সম্পর্কিত কিছু কিংবা মনে হতে পারে কোনো কপি-পেস্ট করার কাজ বুঝি! কিন্তু কপিরাইটিং একদমই তেমন কিছু নয়।

কপিরাইটিং হচ্ছে এমন লেখা যা কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন বা মার্কেটিংয়ের উদ্দেশ্যে কিংবা কাউকে কোনো কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য লেখা হয়।

সোজা কথায় একজন কপিরাইটারের কাজ হচ্ছে একটা পণ্য কিনতে একজন ক্রেতাকে উদ্বুদ্ধ করা।

Wikipedia’র মতে,

Copywriting is the act or occupation of writing text for the purpose of advertising or other forms of marketing

আমরা ফেসবুকের নিউজফিডে প্রায়ই বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখে থাকি। কিংবা শহুরে রাস্তায় দেখি বিলবোর্ডে ছাপানো নানা চটকদার কথায় মুখরিত বিজ্ঞাপন।

এসব বিজ্ঞাপনে পণ্যের সম্পর্কে সুন্দর সুন্দর কথাবার্তা লেখা থাকে। যেটা আমাদের ওই পণ্য সম্পর্কে একটা ইতিবাচক ধারণা দেয় এবং ওই পণ্য কেনার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলে। এই যে সুন্দর ক্যাপশন- এটাই কোনো একজন কপিরাইটারের কাজ!

কপিরাইটিং কেন প্রয়োজন?

ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা অন্যান্য ওয়েবসাইট ব্রাউজ করার সময় আমরা অহরহই বিজ্ঞাপন দেখা যায়। কখনও কখনও ইমেইলেও নানা ধরনের বিজ্ঞাপন আসে। সব বিজ্ঞাপনই কোনো না কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়ে থাকে।

বর্তমান ডিজিটাল দুনিয়ায় সব ব্যবসাই মার্কেটিংয়ের উপর নির্ভরশীল। যে যত ভালোভাবে মার্কেটিং করতে পারবে, তার ব্যবসা তত বাড়বে। স্বভাবতই সকল উদ্যোক্তাই চাইবেন তার ব্যবসার পরিধি বাড়ুক।

সুতরাং ব্যবসা বাড়াতে চাইলে বিজ্ঞাপনকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এখানেই আসে একজন কপিরাইটারের ভূমিকা।

একজন কপিরাইটার যত সুন্দরভাবে একটি পণ্যকে ক্রেতার কাছে ফুটিয়ে তুলতে পারবেন, পণ্য বিক্রির সম্ভাবনা তত বেশি। এখানেই একজন কপিরাইটারের সার্থকতা।

কপিরাইটিং জব বা কাজের ক্ষেত্র

কপিরাইটারদের কাজের ক্ষেত্রের কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডি নেই, বিশেষ করে অনলাইনের বদৌলতে বিভিন্ন জায়গায় কপিরাইটিং জব পাওয়া যায়। তবুও, উল্লেখযোগ্য কিছু ক্ষেত্রের কথা বলা যেতে পারে;

  • বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও)
  • ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে
  • ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সিতে
  • খাদ্যদ্রব্যের মার্কেটিংয়ে
  • বিভিন্ন হেলথকেয়ার পণ্যের প্রমোশনে
  • বিভিন্ন অনলাইন সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানে
  • নন-প্রফিট অর্গানাইজেশনে

এছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে কপিরাইটাররা বেশ ভালো সম্মানী পেয়ে থাকেন।

একজন কপিরাইটার কী কী কাজ করেন?

একজন কপিরাইটারের কাজ বহুমুখী হতে পারে। উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ নিচে দেওয়া হল-

  • বিজ্ঞাপন লেখার কাজ
  • স্লোগান ও ট্যাগলাইন লেখা
  • ল্যান্ডিং পেজ লেখা
  • ইমেইল ক্যাম্পেইনের জন্য ইমেইল লেখা
  • টিভি বা রেডিওর বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট লেখা
  • কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রেস বিজ্ঞপ্তি লেখা
  • ক্যাটালগ লেখা
  • বিলবোর্ড লেখা
  • ব্রশিউর লেখা
  • ভিডিও বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট লেখা ইত্যাদি।

কপিরাইটিং ও কন্টেন্ট রাইটিং এর পার্থক্য

কপিরাইটিং ও কন্টেন্ট রাইটিং দুটোর মধ্যে কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও কার্যত এগুলো এক নয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়-

  • Copywriting এর উদ্দেশ্য হচ্ছে টার্গেট অডিয়েন্স বা ক্রেতার কাছে কোনো পণ্য বিক্রি। কিন্তু কন্টেন্ট রাইটারের কাজ হচ্ছে কোনো তথ্য দেওয়া, কোনো কিছু শেখানো কিংবা বিনোদন দেওয়া।
  • কপিরাইটিং সাধারণত খুব বেশি দীর্ঘ হয় না। কিন্তু কন্টেন্ট রাইটিং এর ক্ষেত্রে সাধারণত দীর্ঘ ফরম্যাটে লেখা হয়।
  • কপিরাইটিং মূলত বিজ্ঞাপন, স্লোগান, ট্যাগলাইন কিংবা ল্যান্ডিং পেজ লেখার জন্য ব্যবহার করা হয়। আর Content writing সাধারণত ফিচার, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, ব্লগ, আর্টিকেল, ইমেইল নিউজলেটার, রিপোর্টের ক্ষেত্রে লেখা হয়।
  • কপিরাইটিংয়ের কার্যকরিতা স্বল্পমেয়াদে মাপা হয়। কিন্তু কন্টেন্ট রাইটিং এর কার্যকারিতা দীর্ঘমেয়াদে মাপা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, কপিরাইটিং এ পাঠককে অল্প কথার মধ্যে পণ্যটির ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলতে হয়। এটা কিছুদিন বা কিছু মাস পর্যন্ত কার্কর হতে পারে। কিন্তু কন্টেন্ট রাইটিং এ চিত্রটি ভিন্ন। এখানে একজন কন্টেন্ট রাইটার পাঠককে লেখার মাধ্যমে কোনো কিছু শেখান, জানান কিংবা বিনোদন দেন। যা বছরের পর বছর ধরে ইফেক্টিভ হতে পারে।

কপিরাইটিং করে আয় করতে চাইলে কী কী করতে হবে?

কপিরাইটিং একটা স্কিল। কপিরাইটিং করে আয় আয় করার জন্য প্রথমে আপনাকে স্কিল ডেভেলপ করতে হবে।

কপিরাইটিং করে আয়

এই স্কিল ধীরে ধীরে অর্জন করতে হয়। নির্দিষ্ট কোনো সূত্র নেই যেটা মুখস্থ করলেই আপনি রাতারাতি দক্ষ কপিরাইটার হয়ে যাবেন। তবুও কিছু বিষয় ফলো করতে হয়।

লেখালেখি

English এ copywriting করতে চাইলে সবচেয়ে বড় কপি রাইটিং টিপস হলো প্রতিদিন ইংরেজিতে কিছু না কিছু লেখার চেষ্টা করুন।

গ্রামাটিক্যাল ভুল এড়িয়ে লেখার চেষ্টা করুন, এজন্য গ্রামারলি কিবোর্ড ব্যবহার করতে পারেন। বারবার লিখুন, এডিট করুন, আরো ভাল করার চেষ্টা করুন।

পড়তে হবে

আপনি যত পড়বেন, তত সহজে আপনি লেখার প্যাটার্ন ধরতে পারবেন। যেহেতু আপনি কপিরাইটিংয়েই আগ্রহী, সেহেতু পরামর্শ থাকবে এই copywriting সম্পর্কিত বিভিন্ন ব্লগ পড়বেন। তাতে দুই লাভ। প্রথমত আপনার কপিরাইটিং বিষয়ে জ্ঞান বাড়বে এবং দ্বিতীয়ত আপনার ইংরেজির দক্ষতা বাড়বে।

রিসার্চ

বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপনের কপিগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করুন। খেয়াল করুন তারা কিভাবে ক্রেতাদের কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট করছে।

ক্রেতার মনোভাব

কোনো একটি পণ্যের টার্গেটেড ক্রেতা কীভাবে চিন্তা করে সেটা ধরার চেষ্টা করুন। তাহলে কপিরাইটিং অনেকটা সহজ হয়ে যাবে।

পোর্টফোলিও

আপনার লেখাগুলোর একটি পোর্টফোলিও তৈরি করুন। কোনো ক্লায়েন্ট আপনার লেখার স্যাম্পল দেখতে চাইলে এই পোর্টফোলিও দেখালে ক্লায়েন্ট আপনার লেখার সম্পর্কে ধারণা পাবে। ফলে কাজ পেতে সুবিধা হবে।

প্রথম ক্লায়েন্ট

আপনার প্রথম ক্লায়েন্ট পাওয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফেসবুকে জবস সেকশনে চোখ রাখুন। লেখালেখি এবং ডিজিটাল মার্কেটিং সম্পর্কিত বিভিন্ন গ্রুপ আছে। এসব গ্রুপগুলোতে অ্যাক্টিভ থাকলে প্রাথমিকভাবে কাজ পেতে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না।

এছাড়াও লিংকডইন একটা ভাল মাধ্যম হতে পারে। প্রাথমিকভাবে কম পারিশ্রমিকে কিংবা ফ্রিতেই লিখে দিতে পারেন। পরিচিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলে তাদের জন্য ফ্রি কাজ করুন।

একইসাথে আপনার লেখা কেমন পারফর্ম করছে সে সম্পর্কে তাদের থেকে ফিডব্যাক নিন। এতে আপনার দুইটি লাভ হবে। প্রথমত, আপনার প্র্যাকটিস হবে, দ্বিতীয়ত, আপনার দক্ষতার সম্পর্কে একটা ভাল ধারণা হবে।

ফলে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস নিয়ে আপনি পেইড ওয়ার্ক কিংবা ফ্রিল্যান্স মার্কেটে যেতে পারবেন।

কাজ চালিয়ে যাওয়া

প্রথমিকভাবে আপনার প্রত্যেকটি কাজের ফিডব্যাকে লক্ষ রাখুন। কোন লেখাটা ভাল পারফর্ম করছে আর কোনটা করছে না। তাহলে নিজের কাজের উন্নতি করা সহজ হবে।

মার্কেটপ্লেসগুলোতে অ্যাক্টিভ থাকুন, ক্লায়েন্টদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করুন। তাহলে ওই ক্লায়েন্ট আবার আপনার কাছেই কাজের জন্য আসবে। একটা সময় চাইলে আপনি আপনার নিজস্ব কপিরাইটিং সার্ভিস এজেন্সি খুলতে পারবেন।

বাংলাদেশে কপিরাইটিং ক্যারিয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা

বর্তমানে বাংলাদেশে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক প্রসার ঘটেছে। যার ফলে কপিরাইটিংএর চাহিদাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

একজন বিগিনার হিসেবে বাংলাদেশে আপনি বিভিন্ন স্টার্ট-আপ কোম্পানি, ই-কমার্স কোম্পানি, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সিতে কাজ করতে পারেন।

এছাড়াও ফ্রিল্যান্সার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে আপওয়ার্ক, ফাইভারসহ নানা ফ্রিল্যান্স প্লাটফর্মে কপিরাইটিং করে আয় করতে পারেন। এসব প্ল্যাটফর্মে কপিরাইটিং এর অনেক চাহিদা রয়েছে।

বিদেশী কোম্পানিগুলো ভাল কপিরাইটিং এর জন্য এসব সাইটে ব্যাপক টাকা ব্যয় করে থাকে। অনেকেই ফ্রিল্যান্স কপিরাইটিং করে মাসে হাজার হাজার ডলার আয় করে থাকে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

কপিরাইটিং নাকি কন্টেন্ট রাইটিং – কোনটি করা উচিৎ?

এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। সম্পূর্ণ আপনার ওপর নির্ভর করে। নিজে ভাবুন, আপনি কি সহজেই মানুষকে কোনো কিছু করতে কনভিন্স করতে পারেন? নাকি কাউকে শেখাতে ভালোবাসেন?

যদি উত্তর প্রথমটা হয় তাহলে আপনি কপিরাইটিংয়ে সহজেই ভাল করতে পারবেন। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে কন্টেন্ট রাইটিংয়ে আপনি ভাল করতে পারবেন।

কপিরাইটিং শিখতে কতদিন সময় লাগতে পারে?

আজীবন! না, অবাক হওয়ার কিছু নেই। কপিরাইটিং শেখা একটি চলমান প্রক্রিয়া। আপনি যত লিখবেন তত শিখবেন। মার্কেটে নতুন নতুন নানা ট্রেন্ড আসবে, আপনার জানার এবং শেখার পরিধিও বাড়তে থাকবে।

কপিরাইটিংয়ের ভবিষ্যৎ কী?

যতদিন ব্যবসা বাণিজ্য আছে ততদিন কপিরাইটিং আছে। তো সে হিসেবে বলা যেতেই পারে যে সুদূর ভবিষ্যতেও কপিরাইটিংয়ের চাহিদা কমবে না।

শেষকথা

কপিরাইটিং কি এখন পরিষ্কার তো!

আপনার শেখার চেষ্টা যদি অব্যাহত রাখতে পারেন তাহলে Copywriting আপনার জন্যই। সঠিক পদ্ধতি আবলম্বন করলে আপনিও পারবেন ঘরে বসেই কপিরাইটিং করে আয় করতে। নিজেকে মার্কেটিং জগতের নিত্য-নতুন ট্রেন্ডের সাথে আপডেট রাখুন।

আপনার সফলতা নির্ভর করছে আপনার লেখা কোনো ক্রেতাকে কতটা আকৃষ্ট করতে পারছে তার উপর। সুতরাং প্রচুর অনুশীলনের বিকল্প নেই। তো, দেরি কিসের? আজই কাজে লেগে পড়ুন! আপনার কপিরাইটিং জার্নির জন্য শুভ কামনা।


Imran Hossain

আমি ইমরান। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাল লাগে। শিখতে ও শিখাতে ভাল লাগে। - এই তো!

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!