প্রাচীনকাল থেকে রান্না ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে জিনিসটির বহুল ব্যবহার লক্ষ্য করা গিয়েছে সেটি হচ্ছে আদা। পেটব্যথা, বমিবমিভাব এবং অন্যান্য শারিরীক সমস্যায় ঘরোয়া চিকিৎসায় আদার উপকারিতা লক্ষণীয়, তাই অনেক আগে থেকেই আদা অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি চিকিৎসা উপাদান।

রান্নায় সাধারণত সতেজ অর্থাৎ কাঁচা বা শুষ্ক আদা ব্যবহৃত হয়। কেউ কেউ আবার তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য রান্না ছাড়াও খেয়ে থাকেন।

আদায় থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান আর্থাইটিস, প্রদাহ ও বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষকগণ বহুমুত্র, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে আদার সহায়ক ভূমিকার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন।

এই প্রবন্ধে, আমরা আদার স্বাস্থ উপকারিতা ও এর পেছনে গবেষকদের বিভিন্ন গবেষণালব্ধ ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো।

আদা খাওয়ার উপকারিতা

আদায় থাকতে পারে প্রদাহ, ব্যকটেরিয়া ও ভাইরাস প্রতিরোধক এবং সর্বোপরি স্বাস্থ্যগত উন্নতির নামাবিধ পুষ্টি উপাদান। নিচে এর সম্ভাব্য কিছু ঔষুধী গুণাবলী উল্লেখ করা হলো:

‌১) অম্লতা হ্রাস করে ও হজমশক্তিবর্ধন করে

বিভিন্ন সংস্থার তৈরিকৃত গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে খাদ্য হজমের সময় প্রাকৃতিকভাবেই দেহাভ্যন্তরে যে অম্লতা সৃষ্টি হয় তা হ্রাসে আদার ভূমিকা রয়েছে।

আদার এই অম্লতানাশক উপকারী গুণাবলির জন্য কিছু কিছু গবেষণাপত্রে আদায় বিদ্যমান এনজাইমকে নির্দেশ করা হয়েছে। এই এনজাইম স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ার পাশাপাশি যেকোনো শারিরীক অস্বস্তি থেকে মুক্তি দেয়।

আদার কার্যকরী প্রভাব প্রতীয়মান হয়েছে খাদ্য হজমকারী এনজাইম ট্রিপসিন ও প্যানক্রিয়েটিক লাইপেজের বিশ্লিষ্টকরনের ক্ষেত্রেও।

উপরন্তু, পরিপাকনালীর অভ্যন্তরে খাদ্যবস্তুর স্বতঃস্ফূর্ত নড়াচড়া এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রতিরোধক হিসেবে ও আদা গ্রহণ করার পরামর্শ দেয়া হয়।

২) বিবমিষা উপশম করে

গবেষণালব্ধ তথ্যমতে প্রাতঃকালীন অসুস্থতা ও ক্যান্সারের চিকিৎসা চলাকালীন বমিবমিভাব উপশমে আদার কার্যকরী ভূমিকা রয়েছে।

২০১০ সালে ৬০ জন শিশু ও যুবাদের যারা কেমোথেরাপি নিচ্ছিলেন তাদের উপর কেমোথেরাপি সংশ্লিষ্ট বমিভাবের প্রতিরোধক হিসেবে

আদার গুড়োর কার্যকারীতা পরীক্ষা করে দেখা যায় যেসব রোগী এটা গ্রহণ করেছেন তাদের বেশিরভাগ এর ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করেছেন।
২০১১ সালে এই জরিপের পর্যালোচনায় পর্যালোচকগণ একই সিদ্ধান্তে উপনিত হন।

তারা এই মর্মে রিপোর্ট প্রদান করেন যে, রোজ ১৫০০ মি:গ্রা আদার নির্যাস গ্রহণ বমিবমিভাব ও এর সমস্ত উপসর্গ উপশমে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

বিবমিষার উপশমে এবং গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনালের মতো জটিল শারিরীক সমস্যার সমাধানে আদার কার্যকারিতা পরিপূর্ণ ভাবে উপলব্ধি করার জন্য তারা আবার মানুষের উপর জরিপ চালানোর আহ্বান করেছেন।

৩) ফ্লু ও ঠান্ডার উপশমে আদার উপকারিতা

সংক্রামক ফ্লু ও ঠান্ডা থেকে সেরে ওঠার জন্য অনেকেই আদা ব্যবহার করে থাকেন। এর পক্ষে পাওয়া গেছে অকল্পনীয় কিছু প্রমাণাদী যা সত্যি সত্যিই এর কার্যকারীতার প্রমাণ বহন করে।

২০১৩ সালে গবেষকদের জরিপে বেরিয়ে আসে আদার আরও কিছু গুণাবলী। মানবদেহের শ্বসনতন্ত্রপী কওছু ভাইরাস সেলের উপর কার্যকরী প্রভাব রয়েছে সতেজ ও শুকনো আদার।

এই ফলাফল আরো নির্দেশ করে যে সতেজ আদার নির্যাস শ্বসনতন্ত্রের প্রতিরক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে যেখানে শুস্ক আদার নির্যাস ব্যর্থ।

ঠান্ডা বা সংক্রামক ব্যাধির প্রতিরোধে ভেষজ ঔষধের জনপ্রিয়তা যাচাই করার জন্য ২০১৩ সালে আরো একটি জরিপের আয়োজন করা হয়। ৩০০ ফার্মেসি ভোক্তাগণের মধ্যে ভোটাভুটি শেষে গবেষকগণ নিশ্চিত হন যে ৬৯% ভোটার ভেষজ ঔষধ সেবনে ইতিবাচক ফলাফল পেয়েছেন।

তবে ফলাফল যাই হোক না কেন যখন আাদার প্রতিষেধক গুণাবলী জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তখনও কিছু অংশগ্রহণকারীকে পাওয়া গিয়েছিলো যারা আদা ব্যবহারে ইচ্ছুক নন।

৪) ব্যথা-বেদনা উপশমে

৭৪ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে করা একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে যে, প্রতিদিন ২ গ্রাম কাঁচা বা রান্না করা আদা গ্রহণের ফলে শতকরা ২৫ জনের ব্যায়াম পরবর্তী মাংস পেশির ব্যথা কমানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গিয়েছে।

ইতোমধ্যে ২০১৬ সালে করা একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে প্রতিবেদকগণ ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে পিরিয়ডের আগে ও পিরিয়ড চলাকালীন ব্যথা উপশমে আদা খাওয়ার উপকারিতা রয়েছে। তা সত্ত্বেও জরিপকারীগণ জরিপটির নিম্নমানের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন।

৫) প্রদাহ-যন্ত্রণা কমানোতে আদার ভূমিকা

একটি অনুসন্ধানকারী দল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে অস্টিওআর্থাইটিসের ফলে সৃষ্ট হওয়া প্রদাহ জ্বালা প্রতিরোধে মুখে আদা রেখে দেয়া একটি নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা।

তা সত্ত্বেও তারা এই গবেষণার ফলাফলকে অসন্তোষজনক আখ্যা দিয়েছেন কেননা এতে খুব কম সংখ্যক অংশগ্রহণকারী ছিলেন যারা আমজনতার প্রতিনিধিত্ব করে না।

ইতোমধ্যে, ২০১৭ সালের একটি পর্যালোচনা যেটা ১৬ টি রোগ সম্পর্কিত পরীক্ষা-নিরিক্ষার সম্নিলিত ফলাফল সেখানে নির্ধারিত হয় যে আদায় বিদ্যমান ভেষজ গুণাবলী প্রদাহ যন্ত্রণার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাও করতে সক্ষম।

পর্যালোচকগণ আরো একটি অনুসন্ধান চালানোর আহ্বান করেন যার মাধ্যমে আদার নির্যাসে আরো যেসব উপকারিতা ও গুণাবলী লুকায়িত আছে তাও বেরিয়ে আসবে।

৬) কার্ডিওভাস্কুলার স্বাস্থ্যসহায়ক আদা

কার্ডিওভাস্কুলার স্বাস্থ্যরক্ষায় আদার নির্যাসের সহায়ক ভূমিকার প্রমান মিলেছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি প্রতিবেদনে সম্প্রতি পাওয়া গিয়েছে দৈনিক ৫ গ্রাম আদার নির্যাস গ্রহণ রক্তের প্লাটিলেটের অত্যধিক বেড়ে যাওয়া হ্রাস করে এর নিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি অব্যাহত রাখে।

তবে এখানেও প্রতিবেদকগণ স্বীকার করেছেন যে আরো বিশ্বাসযোগ্য ফলাফল পাওয়ার জন্য আরো সময় নিয়ে বিস্তৃত পরিসরে গবেষণা করতে হবে।

তথাপি তারা এ সুধারণা ব্যক্ত করছেন যে পুনঃপুন গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবেই এটা প্রমাণ করা সম্ভব হবে যে হৃৎপিণ্ড সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখতে এবং এর চিকিৎসা পরিচর্যায় আদার নিরাপদ ভূমিকা বিদ্যমান।

ইতোমধ্যে, আরো একটি ছোট গবেষণালব্ধ তথ্যমতে জানা গেছে ডায়াবেটিস বা বহুমুত্র রোগের হ্রাস বৃদ্ধির সাথে সাথে হৃৎপিণ্ডের যে অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয় তার পরিত্রাণে আদার নির্যাস অত্যন্ত সহায়ক।

গবেষকগণ চিহ্নিত করেছেন যে আদার কান্ডের নির্যাস যা মূলত অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের আধার তাই এই অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে ভূমিকা রাখে।

৭) ক্যান্সার ঝুঁকি কমায়

আদা কোনো ধরণের প্রোটিন বা এ জাতীয় কোনো পুষ্টি উপাদানের যোগান দেয় না। কিন্তু, এটি একটি চমৎকার এন্টিঅক্সিডেন্টের উৎস। গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, এই কারণেই (এন্টিঅক্সিডেন্ট গুণাগুণ) আদা বিভিন্ন ধরনের অক্সিডেটিভ চাপ হ্রাসে সহায়ক হতে পারে।

অক্সিডেটিভ চাপ তখনই দেখা যায় যখনই অনেক বেশি ফ্রি-রেডিকেল শরীরের ভেতর জন্মাতে থাকে। এই ফ্রি-রেডিকেলগুলো তাদের নিজেদের বিপাকীয় ক্রিয়ায় বিষাক্ত উপাদানসমুহ ও অন্যন্য উৎপাদক তৈরী করে যা দেহের জন্য ক্ষতিকর।

তখন এই ফ্রি রেডিকেলগুলো শরীর থেকে বের করার প্রয়োজন দেখা দেয় যাতে করে কোষগুলোকে নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচানো যায় যা সার্বিকভাবে দেহকে বিভিন্ন রোগব্যাধী যেমন ক্যান্সারের দাঁড়প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারতো। পথ্যের বিচারে, এন্টিঅক্সিডেন্ট শরীরকে এই ফ্রি রেডিকেল হতে পরিত্রাণ দেয়।

২০১৩ সালের একটও গবেষণায়, গবেষকগণ ২০ জনের অংশগ্রহণে একরি জরিপ চালিয়েছিলেন যেখানে প্রত্যেককে ২ গ্রাম আদা ও অক্ষতিকর কিছু ঔষধের বড়ি দেয়া হয়। এরা ছিলেন এমন সব অংশগ্রহণকারী যারা প্রত্যেকেই কলোরেক্টাল ক্যান্সারের উচ্চতর ঝুঁকিতে ছিলেন।

বায়োপসি প্রতিবেদন দেখায় যে, যেসব অংশ গ্রহণকারীগণ আদা গ্রহণ করেছিলেন তাদের খুব কম সংখ্যক লোকেরই নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

এসব লোকবলের দেহের কোলন টিস্যুতে ফ্রি রেডিকেলের বিস্তার ও কমেছে। গবেষকদের এই প্রাপ্তি নির্দেশ করে যে আদা কলোরেক্টাল ক্যান্সারের প্রতিরোধেও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।

৮) পুষ্টিগুণ

যদিও আদা এন্টিঅক্সিডেন্টের বিপুল আধার তথাপি এটি তেমন কোনো ভিটামিন, খনিজ লবণ বা ক্যালোরির যোগান দেয় না। আমেরিকা ভিত্তিক কৃষি অধিদপ্তরের মতে, ২ চা চামচ আদা ৪ ক্যালোরির যোগান দিতে পারে।

তবে, এই পরিমাণ তেমন কোনো গুরুত্বসূচক পরিমাণই নয় যার মাধ্যমে আদাকে একটি পুষ্টিকর খাবারের তালিকায় রাখা যায়।

অতিরিক্ত আদা খাওয়ার অপকারিতা ও ঝুঁকি

যে আদার এত এত উপকারিতা থাকলেও মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণে সৃষ্টি হতে পারে নানাবিধ সমস্যা।

খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন আদাকে পথ্য হিসেবে নিরাপদ বিবেচনা করলেও তারা এখনও এমন কোনো নিশ্চয়তা দেয় নি যে এটাকে এখনই বহুল ভাবে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। গবেষকগণ এখনো আদার অনেক উপাদান আবিষ্কার করতে সক্ষম হন নি।

তাই, বিশেষজ্ঞগণ, এটাকে খাদ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে বলেন।

শেষ কথা

মানবস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আদার উপকারিতা কিংবা ভূমিকা অগ্রগন্য। তবে পরিমিত পরিমাণ গ্রহণই শ্রেয়। দেহকে সুস্থ সতেজ রাখতে নিয়মিত পরিমিত পরিমাণ আদা গ্রহনের বিকল্প নেই।


Salsabil Jannat

A student of Dhaka University.

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

nineteen + two =

error: Content is protected !!