প্রতিবেদন লেখার নিয়ম শিক্ষা জীবন থেকে শুরু করে কর্ম জীবন, সর্ব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয়। কিন্তু, প্রায়শই লেখার দরকার হয়না বলে অনেকেই প্রতিবেদন লেখার ফরম্যাট নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন। তাছাড়া, বিষয় সাপেক্ষে প্রতিবেদন লেখার নিয়ম পরিবর্তিত হয়, তাই মনে রাখা বেশ কষ্টকরই বটে।

পূর্বে আমরা দরখাস্ত লেখার নিয়ম নিয়ে জেনেছি। আজ এখানে আমি বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেদন এর নমুনা ও সুন্দর প্রতিবেদন লেখার কৌশল বর্ণনা করার চেষ্টা করবো ইন-শা-আল্লাহ।

প্রতিবেদন বলতে কোন নির্দিষ্ট বিষয় বা ঘটনা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যানুসন্ধান ভিত্তিক বিবরণী বোঝায়। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ রিপোর্ট (Report)। যিনি প্রতিবেদন রচনা করেন, তাকে বলা হয় প্রতিবেদক।

প্রতিবেদকের দায়িত্ব হল কোন ঘটনা, তথ্য বা বক্তব্য সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত, সিদ্ধান্ত, ফলাফল ইত্যাদি খুঁটিনাটি অনুসন্ধানের পর বিবরণী তৈরি করে কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোন কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্য পেশ করা।

মূলত সংবাদপত্র বা  সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের উপযোগী তথ্য সমৃদ্ধ সহজ সরল ভাষায় সংবাদ পরিবেশন করাকে বলা হয় প্রতিবেদন। সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় সঠিক তথ্য দিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে পাঠক-কে একটি সুস্পষ্ট ধারনা দিতে হয়।

অর্থাৎ, প্রতিবেদন হলো কয়টি সুসংগঠিত তথ্যগত বিবৃতি যা কোন বক্তব্য সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত অথচ সঠিক বর্ণনা বিশেষ। একে যথেষ্ট সতর্কতা, পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা, গবেষনা ও বিচার বিশ্লেষণের পর তৈরি করতে হয়। প্রতিবেদনের মাধ্যমে কোন বিষয়ে সত্যনিষ্ঠ তথ্য দ্বারা সুসজ্জিত করে পুণরায় উপস্থাপন করা হয়ে থাকে।

সূচীপত্র

প্রতিবেদনের শ্রেণিবিভাগ

প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণি বা প্রকারভেদ নেই। প্রতিবেদন নানান প্রকার হয়ে থাকে। বিষয়ের বৈচিত্র্য অনুযায়ী প্রতিবেদনের নানা বৈচিত্র্যের সৃষ্টি হয়। প্রতিবেদন সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে।

  • সংবাদ প্রতিবেদন।
  • প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন।
  • তদন্ত প্রতিবেদন।

এছাড়াও বিভিন্ন প্রকার প্রতিবেদনের মধ্য উল্লেখযোগ্য হল:

  • ঘটনা বা দুর্ঘটনা জনিত প্রতিবেদন। 
  • সাক্ষাৎকার ভিত্তিক প্রতিবেদন। 
  • রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিষয়ক প্রতিবেদন।
  • সম্পাদকীয় প্রতিবেদন ইত্যাদি।

প্রতিবেদন লেখার নিয়ম

প্রতিবেদন হতে হবে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো সম্বলিত এবং প্রতিবেদক সঠিক নিয়মানুযায়ী তা রচনা করবেন। মূলত কোন নির্দিষ্ট ঘটনা অবলম্বনে তা সম্পর্কে বিস্তারিত লিখতে হয় এবং তার বক্তব্য হবে যুক্তি যুক্ত। প্রতিবেদন নিরপেক্ষভাবে রচনা করতে হয় এবং তাতে প্রতিবেদকের ব্যক্তিগত আবেগের স্থান লাভের কোন সুযোগ নেই। যা সত্য তা-ই উঠে আসবে প্রতিবেদকের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। প্রতিবেদনে বক্তব্যের সমাপ্তি ঘটবে উপসংহার ও সুপারিশের মাধ্যমে।

প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন লেখার নিয়ম

উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন তৈরি করার ক্ষেত্রে নিচের নিয়ম অনুসরণ করা যেতে পারে।

তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বরাবর,

চেয়ারম্যান (রিপোর্টিং বসের ডেজিগনেশন)

প্রতিষ্ঠানের নাম

প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা

বিষয় : ___________________________________________________ প্রতিবেদন।

সূত্র/স্মারক নং: জেবিএল/সিএডি/প্রতিবেদন/২০২১-১ তারিখ: ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১।

জনাব,

বিনীত নিবেদন এই যে, আপনার আদেশ নং জেবিএল/সিএডি/প্রতিবেদন/২০২১-১ তারিখ: ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ অনুসারে (বিষয়ে যা লিখেছেন তা লিখবেন) … … … উপলক্ষে প্রতিবেদনটি নিম্নে পেশ করছি।

(রিপোর্টের শিরোনাম)

বিবরণ: প্রয়োজন অনুসারে ৩/৪টি প্যারা।

মতামত:

প্রতিবেদকের স্বাক্ষর

প্রতিবেদনের বিষয়

প্রতিবেদনের সময়

প্রতিবেদনের তারিখ

প্রতিবেদনের স্থান

প্রতিবেদকের নাম ও ঠিকানা

প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন লেখার নমুনা

প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন লেখার নিয়ম

সংবাদ প্রতিবেদন লেখার নিয়ম

শিরোনাম ছাড়া সংবাদ প্রতিবেদন হয় না। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খবরের একটি সংক্ষিপ্ত বিষয়বস্তু শিরোনামে প্রকাশ পায়। শিরোনাম দেখেই পাঠক সিদ্ধান্ত নেন, খবরটি তিনি পড়বেন কি-না। প্রতিবেদকের নাম বা পদবী, প্রতিবেদন তৈরির স্থান ও ঘটনার একটা সংক্ষিপ্ত বিষয়বস্তু নিয়ে শুরু হয় সংবাদ প্রতিবেদন। এটা দু’তিন লাইনের মধ্যে শেষ হয়ে থাকে। এরপরের অংশে বিস্তারিত বর্ণনা লিখতে হয়।

সংবাদ প্রতিবেদন এর কাঠামো

১. শিরোনাম: যে বিষয়ে প্রতিবেদন লিখা হবে, সে বিষয় সংক্রান্ত একটা চমকপ্রদ শিরোনাম লিখতে হবে।

২. ভূমিকা: ভূমিকা অংশ হবে সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট। এই অংশ আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যেন ভূমিকা অংশ পড়ার পর পাঠক সম্পূর্ণ প্রতিবেদন পড়তে আকৃষ্ট হয়। তাই এই অংশে বিশেষ জোর দিতে হবে।

৩. সূত্র: বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত সূত্র এখানে লিখতে হবে। 

৪. ব্যক্তিনাম পরিহার: প্রতিবেদনে ব্যক্তিনাম পরিহার করে পদমর্যাদা (সচিব, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক), সাধারণ পরিচয় যেমন: বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা, কারখানার শ্রমিকেরা কিংবা ভুক্তভোগী এলাকাবাসী, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তি ইত্যাদি ব্যবহার করা।

৫. বিবিধ তথ্য: সংবাদ প্রতিবেদনে স্থান, কাল ইত্যাদি তথ্য দিতে থাকতে হবে।

সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্য প্রতিবেদন লেখার নমুনা

প্রতিবেদনের প্রকৃতি: (পত্রিকার কোন পাতাতে যাবে।)

প্রতিবেদনের বিষয়: (যে ধরনের প্রতিবেদন তা লিখবেন।)

প্রতিবেদনের সময়:

প্রতিবেদনের তারিখ:

প্রতিবেদনের স্থান:

প্রতিবেদনের শিরোনাম:

বিবরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক ইত্তেফাক (বিবরণ শেষে বসবে।)

প্রতিবেদনের সময়কাল

প্রতিবেদকের স্বাক্ষর

সংবাদপত্রে প্রকাশনার জন্য প্রতিবেদন লেখার নমুনাসংবাদপত্র প্রতিবেদন পত্র লেখার নমুনাতদন্ত প্রতিবেদন লেখার নিয়ম

সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন লেখার নিয়মের সাথে তদন্ত প্রতিবেদন লেখার আংশিক মিল রয়েছে। তবে সংবাদ প্রতিবেদনের সাথে এটা মিলবে না। এতে লেখকের ব্যক্তিগত মতামতের গুরুত্ব রয়েছে। দায়িত্ব প্রদানকারী কতৃপক্ষের সমীপে তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে হয়। প্রতিবেদনের সূচনায় ঘটনা ও ঘটনার কার্যকারণ ব্যাখ্যা করার পর ঘটনার পুুনরাবৃত্তি নিরসনকল্পে করণীয় সম্পর্কে প্রতিবেদককে সুপারিশ করতে হয়। মনে কর, মহাসড়কের কোন একটি স্থানে বার বার সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে থাকে।তদন্ত প্রতিবেদন নমুনা

ফলোআপ প্রতিবেদনে ঘটনাটির রিক্যাপ করুন

ফলোআপ প্রতিবেদনে অন্তত শেষের প্যারায় ঘটনাটির রিক্যাপ করতে হবে। দীর্ঘ বিলম্বিত ফলোআপ রিপোর্টে মূল ঘটনাটি কবে, কোথায়, কখন, কিভাবে ঘটেছিল তা উল্লেখ করে দিলে পাঠকের স্মরণ করতে সুবিধা হবে অর্থাৎ পূর্বের প্রতিবেদনের কিছুটা উল্লেখ করা প্রয়োজন।

কোনো সমীক্ষা উল্লেখ করলে তা কাদের, কবে করা, কী পদ্ধতিতে তৈরি- তা না জানালে পাঠক মনে করবে রিপোর্টারের নিজের বক্তব্য সমীক্ষার নামে তুলে দেয়া হয়েছে।

একজন গবেষকের গবেষণার ফলাফল কিংবা একটি প্রবন্ধের তথ্য নিয়েও রিপোর্ট করা যেতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে প্রবন্ধে উল্লেখিত সমস্যা-সম্ভাবনা-পরিসংখ্যান সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বা কোনো পাঠকের মন্তব্য নিয়ে খবর বানাতে হবে।

প্রতিবেদনের প্রয়োজনীয়তা

নির্দিষ্ট কোন বিষয়বস্তু বা ঘটনা সর্ম্পকে কর্তৃপক্ষকে সুস্পষ্টভাবে অবহিত করার জন্য প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যবসা-বানিজ্য, আইন আদালত ও অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতিবেদনের বিশেষ গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

আগে সাধারনত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত বিবরণীকেই প্রতিবেদন বলে অবহিত কলা হয়েছে বা হত। কিন্তু বর্তমান কালে সমাজ জীবনের বিচিত্র জটিলতার প্রেক্ষিতে নানা জাতের প্রতিবেদনের গুরুত্ব বেড়েছে। এর উপযোগিতা মানুষের দৈনিক জীবনেও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতিবেদনের বক্তব্য হবে নিরপেক্ষতার বৈশিষ্ট্য অনুসারী। একইসাথে এতে জটিল বিষয়ের সাবলীল ব্যাখ্যা থাকবে। প্রতিবেদনে প্রতিবেদক কোন বিষয় সম্পর্কে কতৃপক্ষের নিকট তার মতামত পেশ করেন। প্রতিবেদন থেকে আলোচিত বিষয় সম্পর্কে খুঁটিনাটি তথ্য অবগত হওয়া যায়।

প্রতিবেদনের মাধ্যমে কোন বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহন, সংগঠন, নির্দেশনা, নিয়ন্ত্রণ, ফলাফল নিরূপণ, সমন্বয় সাধন ইত্যাদি কাজে সহায়তা পাওয়া যায়।

প্রতিবেদন কাজের সমন্বয় সাধন ও সিদ্ধান্ত গ্রহনে সহায়তা করে,  কোনো কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান করে। সেইসাথে কাজটির সফলতা বা ব্যর্থতা নিরূপণ করে।

সুন্দর প্রতিবেদন লেখার কৌশল

প্রতিবেদন রচনার পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত থাকলে উত্তম প্রতিবেদন প্রণয়ন করা সম্ভব। এসব পদ্ধতির মধ্যে আছে প্রতিবেদনের আকার, শ্রেণী, বৈশিষ্ট্য, রীতিনীতি ও বিন্যাস।

প্রতিবেদনের আকার সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন সীমাবদ্ধতা নেই। বিষয়ের গুরুত্ব ও পরিধি অনুসারে তা ছোট হতে পারে, বড়ও হতে পারে। ছোট আকারের প্রতিবেদনে শিরনাম, বিষয়বস্তু সুপারিশ ও উপসংহার থাকে।

বড় প্রতিবেদন পুস্তকাকারে হতে পারে এবং তাতে বিভিন্ন প্রকারের সারণি, চিত্র, নকশা, ছক, পরিশিষ্ট, তথ্যনির্দেশ ইত্যাদি সহ বর্ণনা ও ব্যাখ্যা সংযুক্ত করা হয়।

প্রতিবেদনের আবশ্যিক কিছু অংশ

শিরোনাম:

প্রতিবেদকের নাম:

স্থান:

তারিখ:

এই চারটি মৌলিক বিষয় একটি প্রতিবেদনে থাকতেই হবে। এগুলো ছাড়া  প্রতিবেদনটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এগুলো একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে লিখতে হবে ।

১. শিরোনাম: প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল শিরোনাম। শিরোনাম এমন হবে যেন শিরোনাম দেখে পাঠকের কৌতূহল জাগে এবং প্রতিবেদনটি পড়ার ইচ্ছা হয়। শিরোনামের সঙ্গে বিষয়বস্তুর মিল থাকা আবশ্যিক।

২. প্রতিবেদকের নাম: যেকোনো সংবাদপত্রে একটু  ভালোভাবে লক্ষ্য করলেই দেখতে  পাবেন সেখানে প্রতিবেদকের নাম লেখা থাকে। আবার কোন কোন প্রতিবেদনে সরাসরি প্রতিবেদকের নাম না দিয়ে  সেখানে ” নিজস্ব প্রতিনিধি ”  এরকম ধরনের কিছু লেখা হয়। 

৩. স্থান: প্রতিবেদক যে স্থান থেকে প্রতিবেদনটি লিখছে  সেই স্থানের নাম কিংবা ঘটনা স্থলের নাম লিখতে হবে। 

৪. তারিখ: তারিখ বিভিন্ন ভাবে লেখা গেলেও মূলত তা পুরোপুরি বাংলায় লিখতে হবে।

প্রতিবেদন রচনায় যেসব বিষয় লক্ষ্যণীয়

সুনির্দিষ্ট কাঠামো

প্রতিবেদন নির্দিষ্ট কাঠামো ও নিয়মানুযায়ী প্রণয়ন করতে হবে। কোন প্রতিবেদন প্রণয়নকালে একটি নির্দিস্ট কাঠামো অনুসারে করতে হয়। এতে থাকবে একটি শিরোনাম, প্রাপকের নাম-ঠিকানা, আলোচ্যবিষয়ের সূচিপত্র, বিষয়বস্তু, তথ্যপঞ্জি, স্বাক্ষর, তারিখ ইত্যাদি।

নির্ভুল তথ্য

প্রতিবেদন রচিত হবে সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। তথ্যানুসন্ধান ই হল প্রতিবেদনের প্রধান কাজ। সেজন্য তথ্যের যথার্থতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা বিষয় অবলম্বনে রচিত প্রতিবেদনটি বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর হতে হবে। ধারণার ওপর নির্ভর করে সুড়সুড়ি দেয়া স্টোরি তৈরি করা যায়, গল্প লেখা যায়, ভালো রিপোর্ট হয় না।

পাঠকের মনোরঞ্জনকারী তথ্য প্রদানের পূর্বে প্রতিবেদককে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। বর্ণনা যাতে অসঙ্গতিপূর্ণ এবং অতিমাত্রায় ব্যাখ্যামূলক না হয়।

রিপোর্ট পড়তে পড়তে যতই সামনে এগুনো হোক, কখনোই যেন মনে না হয় যে- রিপোর্টের মূল ফোকাস থেকে দূরে সরে গেছে।

তথ্যের পরিপূর্ণতা

প্রতিবেদন যেসব তথ্য পরিবেশিত হবে তা হতে হবে নির্ভুল, সম্পূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য। এতে প্রতিবেদকের ব্যক্তিগত আবেগ স্থান পাবে না।

বক্তব্যের স্পষ্টতা

প্রতিবেদকের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্টতা থাকবে যাতে বক্তব্য বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা লাভ করা সহজ হয়। সংবাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অর্থাৎ খবর হিসেবে যা গুরুত্বপূর্ণ, তা-ই প্রতিবেদনে স্থান পাবে।

সংক্ষিপ্ততা

প্রতিবেদন হবে বাহুল্যবর্জিত। বক্তব্য হবে সুনির্বাচিত এবং কোন অনাবশ্যক বক্তব্য সংযোজিত হতে পারেনা। অযাচিত বক্তব্য যথাসম্ভব পরিহার করতে হবে। ভাষায় গতিশীলতা না থাকলে ভালো প্রতিবেদন লেখা হয় না। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য দিয়েই সূচনাটি সাজানো যায়। অর্থাৎ সূচনাটি হবে সংক্ষিপ্ত কিন্তু অনেক বেশি সমৃদ্ধ। অর্থাৎ প্রতিবেদন যাতে খুব ডিস্টার্বিং না লাগে। খুঁটিনাটি তথ্য বেশি দিয়ে রিপোর্ট বড় করার প্রবণতা বাদ দিতে হবে।

সুন্দর উপস্থাপনা

প্রতিবেদনের উপস্থাপন হবে আকর্ষণীয় ও পরিপাটি। এর বক্তব্য সহজ সরল ভাষায় প্রকাশ পায় যেন তা সকলের বোধগম্য হয়।

ভাষার দুর্বলতা নয়

প্রতিবেদনে প্রচলিত ধারার কাঠামো ও বিন্যাস অনুসরণই যথেষ্ট নয়, ভাষার দুর্বলতাও থাকা যাবে না। ভেতরে অপ্রয়োজনীয় কথা রেখে প্রতিবেদনকে মেদযুক্ত বানানোর দরকার নেই। শিরোনামের মধ্যে প্রতিবেদকের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। অতিরিক্ত ও ভুল শব্দ ব্যবহার মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই তথ্য বারবার না দিলে রিপোর্ট স্ট্রং হয়। একই তথ্য একাধিকবার দিলে রিপোর্ট ছোট করা কঠিন হয়ে পড়ে। 

সুপারিশ

প্রতিবেদনে উপসংহারে সুপারিশ সংযোজন করতে হবে যাতে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ সমস্যা সম্পর্কে সিদ্ধন্ত গ্রহন করতে পারে। প্রতিবেদনের মন্তব্য বা সুপারিশ হবে সহজ-সরল, নিরপেক্ষ, যুক্তিযুক্ত ও বাহুল্যবর্জিত। প্রতিবেদকের কাছে বিশেষভাবে প্রত্যাশিত যে, তাঁর সংবাদ পারতপক্ষে এমন কোনো বিশেষণ ব্যবহার করবে না, যার ফলে তাঁর রচনা পক্ষপাতদুষ্ট মনে হয়।

তথ্য স্ট্রং করতে সোর্স উল্লেখ

অফিসিয়াল সোর্সের বক্তব্য উল্লেখ করতে পারাটা ভালো। সোর্স পোক্ত না হলে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার সময় সচেতন থাকতে হবে। গুরুতর অভিযোগ থাকলে অপরাধ প্রতিবেদন রচনার কলাকৌশল যথাযথভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

কখনোই ঢালাও মন্তব্য নয়

সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কখনোই ঢালাও মন্তব্য করা ঠিক নয়; ঢালাও মন্তব্যে রিপোর্ট দৃঢ় হয় না, নানান বিপদ আসতে পারে। দুর্বল ইন্ট্রো অতিদীর্ঘ হলেও তা দিয়ে সুন্দর রিপোর্ট হয় না, ভাষা দুর্বল হলে নাতিদীর্ঘ ইন্ট্রো যুৎসই হয় না। ভাষাকে টাচি করতে না পারলে পাঠকের মানবিক আবেদনে নাড়া দেবার মতো প্রতিবেদন তৈরি করা যাবে না। প্রতিবেদনে বড় বড় ইংরেজি কোটেশান দেয়া যাবে না, আইনের উদ্ধৃতিগুলো প্রয়োজনে চুম্বক অংশ বাংলায় অনুবাদ করে দিতে হবে। আইনের উপধারাগুলো বাংলা করলে পাঠককে বোঝানো সহজ, বেশি পাঠযোগ্য হয়। আরো অনেক উপায় আছে- এরকম না বলে কী ধরনের উপায় কোনো ইন্ডিকেশন থাকা ভালো। তথ্যকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজন অবশ্যই আছে তবে তা যাতে অতিরঞ্জিত না হয়। তথ্যের পুনরাবৃত্তি করা যাবে না।

পরস্পর বিরোধী তথ্য নয়

তথ্য যাতে পরস্পর বিরোধী হয়ে না যায়। দেখতে হবে যেন রিপোর্টে স্ববিরোধী কোনো বক্তব্য না থাকে। বিভ্রান্তিকর কোনো রিপোর্ট করা পেশাদার আচরণ নয়। অতিকথন পরিহার করলে প্রতিবেদনের ওজন বাড়ে। এছাড়া রিপোর্টের ফলোআপ করা যে একটি আবশ্যিক বিষয় এটিও প্রতিবেদককে মনে রাখতে হবে। বিশেষ করে সিরিজ রিপোর্টে তথ্য ও ধারা-বর্ণনা পাঠযোগ্য ও কৌতূহলোদ্দীপক হতে হবে। রিপোর্টে নানান প্রশ্ন তোলাই যথেষ্ট নয়, প্রশ্নের ব্যাখ্যা বা প্রমাণভিত্তিক তথ্য থাকতে হয়। অযাচিতভাবে কোনো প্রসঙ্গ আনা যাবে না। সূচনা যে বিষয় নিয়ে করা হয়েছিল তার সাথে সম্পর্কহীন কোনো প্রসঙ্গ যাতে না আসে, রিপোর্টের শুরুর মেজাজটি যাতে নষ্ট হয়ে না যায়। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যেমন গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপন করতে হবে, গুরুত্বহীন তথ্য তেমনই সচেতনভাবে এড়িয়ে যেতে হবে। কেউ যাতে বলতে না পারে- প্রতিবেদনটি সুসংগঠিত নয়, এই শব্দটি/বাক্যটি/প্যারাটি এখানে খাপ খায় না।

পাঠকের জন্য সহজ করে লিখতে হবে

তথ্য বিন্যাসের ক্ষেত্রে ধারাক্রমে এগুতে হবে, যাতে পাঠক ধৈর্য না হারায়। প্রয়োজনে উপশিরোনাম ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে তা সব ধরনের রিপোর্টের জন্য আদর্শ বা অনুকরণীয় হবে না। চমৎকার সংবাদ সূচনা, করতে হবে- যথাযথ সূত্রের সাথে আলাপ, এক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অন্য সূত্রের সাথে যাচাই। তথ্য কোথা থেকে এলো তা স্পষ্ট করা জরুরি।

পক্ষপাতিত্ব করা যাবে না, অতি আবেগ পরিহার করতে হবে

প্রতিবেদক সৎ ও সংবেদনশীল হবেন, পাঠকের মন নাড়া দিতে ভাষা ব্যবহারে অতিমাত্রায় আবেগী হবেন না বা পক্ষপাতিত্ব করবেন না। রিপোর্টারের সরাসরি মন্তব্য ও নিজস্ব পরামর্শ প্রতিবেদনে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। সংশ্লিষ্ট মহল বা পর্যবেক্ষকের নামে মন্তব্য জুড়ে দেয়া রিপোর্টের অঙ্গহানি করে। ভাষা ও বিশেষণের ব্যবহার যাতে এমন না হয় যে রিপোর্ট দেখে মনে হবে রিপোর্টার ঘটনাটিকে যেভাবে দেখতে চেয়েছেন সেভাবেই স্টোরিটি সাজিয়েছেন।

সরাসরি অভিযোগ আনা যাবে না

একটি খাতের সব সমস্যা নিয়ে একটি রিপোর্ট যথেষ্ট নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে একটি বিশেষ সমস্যাকে মূল বিষয় ধরে সমস্যা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে রিপোর্ট করা যেতে পারে। ছোট ছোট কয়েকটি রিপোর্ট হতে পারে। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো দাবিও প্রতিবেদকের নিজ থেকে উপস্থাপন না করে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে উপস্থাপন করাতে হবে। যেসব প্রতিবেদনে পদে পদে মানহানি মামলার আশঙ্কা থাকে, সেসব প্রতিবেদনে সরাসরি অভিযোগ আনা রিপোর্টারের পক্ষে অনুচিত। গোয়েন্দা স্টোরি বানানো প্রতিবেদকের কাজ নয়, পুলিশি ডিটেকটিভের কাজ সাংবাদিকতার নীতি বিরুদ্ধ।

প্রতিবেদন লেখার নিয়ম নিয়ে শেষ কথা

পরিশেষে একজন রিপোর্টার এমনভাবে প্রতিবেদন তৈরি করবেন যেন তাতে কেউই লাল-নীল কালির আঁচড় দিতে না পারেন। সহ-সম্পাদকের কলম যত কম একটি প্রতিবেদনের ওপর চলবে তত ভালো প্রতিবেদন সেটি, সেই প্রতিবেদকের কদরও তত বেশি।

একটি প্রতিবেদনে অনেক ধরনের সীমাবদ্ধতা-সমস্যা-ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে। সেসব সতর্কভাবে কাটিয়ে উঠতে পারলে একটি সাধারণ রিপোর্টও সৃজনশীল চিন্তা ও বিষয়-বৈচিত্র্যের জন্য অসাধারণ হয়ে ওঠতে পারে।

কোনো কোনো প্রতিবেদনে প্রচুর পরিসংখ্যান থাকে কিন্তু পরিসংখ্যানগুলো কাদের তা উল্লেখ থাকে না। কিছু প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের বক্তব্য থাকে না অথচ বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনে একতরফা বক্তব্য স্থান পেতে পারে না।

বর্ণনার ভাষা যদি রিপোর্টারের ভাষার মতো না হয়, অনেক বেশি তথ্যের সন্নিবেশের পরও তথ্যবিন্যাস ঠিকমতো না হলে, সোর্স উল্লেখ না থাকলে সেই প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য বিবেচিত হয় না।

উপরোল্লিখিত সকল প্রতিবেদন লেখার নিয়ম ও নমুনায় উল্লেখ করা বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রেখে প্রতিবেদন রচিত হলে আপনার প্রতিবেদনটি সকলের নিকট প্রশংসিত হবে।


0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!