কথায় আছে “হার্ড স্কিল ছাড়া চাকরি পাওয়া যায় না, কিন্তু সফট স্কিল ( Soft skill ) ছাড়া চাকরি ধরে রাখা যায়না”। আসলে এর অর্থ কি? বাক্যটি দ্বারা এটাই বুঝায় যে, আপনি যদিও কাজে অনেক দক্ষ এবং নিজের কাজে মি. পারফেক্ট হয়ে থাকেন, কিন্তু একজন টিম মেম্বার হিসেবে কারো কাছেই পছন্দনীয় নন, তাহলে সম্ভবত আপনাকে আবারও নতুন কর্মক্ষেত্র খুঁজতে হতে পারে। ক্যারিয়ারে সফলতা পেতে সফট স্কিল থাকা এখন আবশ্যক।

প্রতিযোগিতার এই যুগে চাকরিদাতারা শুধু কাজে দক্ষ আর Hard skills দেখে চাকরি দেয়না। তাদের এমন কোন রোবটিক কর্মী প্রয়োজন নেই যে কিনা শুধু তাদের কাজ করে দেবে কিন্তু তার মধ্যে দলগতভাবে কাজ করার ক্ষমতা নেই, কোন নেতৃত্ব গুণ নেই। তারা এমন একজন সফট স্কিল সম্পন্ন টিম মেম্বার খুঁজেন যার সাথে কাজ করতে যেকেউ ইচ্ছা পোষণ করবে।

সিভিতে তো আমরা নিজেদের সফট স্কিলগুলো উল্লেখ করি, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে উন্নতি করার জন্য সফট স্কিলস প্রয়োগ করাও জরুরী। সফট-স্কিল যে শুধু কর্ম ক্ষেত্রেই প্রয়োজন তা কিন্তু নয়, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ।

হার্ড স্কিল কি? ( what is hard skill in Bangla )

হার্ড স্কিল বলতে সেইসব পরিমাপযোগ্য টেকনিক্যাল দক্ষতাকে বুঝায় যা আপনি একাডেমিক লাইফে এবং বিভিন্ন ট্রেনিং এর মাধ্যমে শিখেছিলেন। হার্ড স্কিল আপনি কি কাজ করতে পারেন তা নির্ধারণ করে দেয়।

সফট স্কিল কি? ( what is soft skill in Bangla )

সফট স্কিল বলতে নন টেকনিক্যাল এবং অপরিমাপযোগ্য সেইসব দক্ষতাকে নির্দেশ করে যা একজন মানুষকে সামাজিক, দলগতভাবে কাজ করার ক্ষমতা এবং নেতৃত্বগুণ গুনাগুণ সম্পন্ন করে গড়ে তোলে। একজন কর্মী তার কাজ কিভাবে সম্পন্ন করে তা নির্ভর করে তার সফট স্কিলের উপর।

কর্ম জীবনে  উন্নতি করতে যেসব সফট স্কিল প্রয়োজন

এখানে আমরা কর্পোরেট লাইফ কিংবা সরকারী চাকরি, যেকোন জায়গায় প্রয়োজনীয় সফট স্কিলগুলো নিয়ে আলোচনা করবো। যে স্কিলগুলো আপনার কর্ম জীবনে উন্নতি করতে সাহায্য করবে।

১) নেতৃত্ব :

একদল কর্মীর মাঝেও একজন নেতৃত্বগুণ সম্পন্ন কর্মীকে সহজেই আলাদা করা যায়। অনেকেই বলেন নেতৃত্ব গুণ স্বকীয় বৈশিষ্ট্য এবং পরিবার থেকেই আমরা এই গুণাবলী পেয়ে থাকি, ১০০% ভুল কথা। লক্ষ্য করে দেখুন তো ভাল রাজনীতিবিদের সব ছেলে-মেয়েই কি ভাল নেতা হতে পেরেছে? কিংবা কোম্পানীর উত্তরসূরীরা দায়িত্বে আসার পর কি সকল কোম্পানীই আগের মতো মাথা উঁচু রাখতে পেরেছে!

সফট-স্কিল-নেতৃত্ব

প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য কর্মীদের সাথে সুন্দর করে কথা বলা, একে অপরের খোঁজ রাখা,  অন্যের সমস্যায় এগিয়ে আসার মতো ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে আপনার প্রতি সহকর্মীদের আস্থা সৃষ্টি হবে।

ভাল প্রেজেন্টেশন, পাবলিক স্পিকিং, সফল ক্লায়েন্ট ডিল করার মাধ্যমে আপনার নেতৃত্বগুণ উম্মুক্ত হতে থাকবে। তাছাড়া একজন ভাল নেতার আর্টিকেলে উল্লেখ করা সবগুলো স্কিল থাকা উচিৎ।

২) কমিউনিকেশন

ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক কিংবা কর্ম জীবন সব জায়গায় যোগাযোগের প্রয়োজন রয়েছে। আপনি কি চান বা কি প্রয়োজন তা যদি অন্যকে বুঝাতে না পারেন তবে তা সত্যিকার অর্থেই সমস্যা হয়ে উঠবে।

আপনার পার্সোনালিটি আপনার কমিউনেকশন দক্ষতার মধ্য দিয়ে অনেকাংশে ফুটে ওঠে। তাই যেকোন স্কিলের চেয়ে কমিউনিকেশ স্কিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই স্কিলটি ডেভলপ করতে পারলে আপনার মধ্যে আরো অনেক সফট স্কিল আপন-আপনি জন্ম নিবে।

কমিউনিকেশন স্কিলের বিস্তৃতি এত বিশাল যে একে কিছু ছোট ছোট দক্ষতায়ও ভাগ করা যায়। কিছু নির্দষ্ট বিষয়ের উপর চর্চা করে কমিউনিকেশন স্কিল বাড়ানো সম্ভব। যেমন-

  • মনোযোগের সাথে শ্রবণ : কেউ আপনার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলে অথবা কোন স্পিকার, উপস্থাপক বক্তব্য রাখার সময় মনোযোগের সাথে শুনুন। তার মুখের দিকে তাকিয়ে eye contact ঠিক রাখুন। বক্তব্যে বাধা না দিয়ে মাঝে মাঝে উপযুক্ত প্রশ্ন করুন, যেন তিনি বুঝতে পারেন আপনি তার বক্তব্য ভালভাবেই শুনছেন এবং বুঝতে পারছেন।
  • পরিষ্কারভাবে আইডিয়া শেয়ার করুন : কোন বিষয়ে কারো সামনে আইডিয়া উপস্থাপন করার আগে ভাল করে প্লান করুন এবং কথাগুলো গুছিয়ে নিন। অযাচিত তথ্য কিংবা অনর্থক শব্দ বা সাউন্ড করা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন।
  • নিজের মনকে উম্মুক্ত রাখুন : অবশ্যই আপনি সবার সকল মতামতের সাথে একমত হতে পারবেন না। কিন্তু সবার মতামত শোনা এবং তার প্রতি সম্মান রাখা আপনার কর্তব্য। অপ্রয়োজনীয় তর্কে জড়িয়ে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করবেন না।

৩) আত্মবিশ্বাস

চাকরিদাতারা সবময়ই একজন কনফিডেন্ট কর্মীর খোঁজ করে, যে প্রয়োজনের সময় নিজ থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আত্মবিশ্বাস হলো নিজের জ্ঞান, দক্ষতা, বিচার-বুদ্ধি ও যোগ্যতার উপর আস্থা  এবং বিশ্বাস।  নিজে  কি বলছেন তার উপর যদি আপনি নিজেই বিশ্বাস করতে না পারেন, তবে অন্যরা কিভাবে করবে? অনেকে ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটিসের কারণে আত্মবিশ্বাসী হয়ে থাকে, তবে প্রাকটিসের মাধ্যমে এখনো আত্মবিশ্বাস আর্জন করা সম্ভব।

৪) সমস্যা সমাধান

কোম্পানিতে দুই ধরনের কর্মী থাকে, প্রথমত যারা সমস্যা দেখে বসকে জানায় এবং সে বিষয়ে আর কোন আপডেট রাখার প্রয়োজন মনে করেনা। দ্বিতীয় দলের সদস্যরা সমস্যা দেখার সাথে সাথে সমাধানের পথ খুঁজতে শুরু করে।

দ্বিতীয় দলের কর্মী এবং প্রথম দলের কর্মীদের মাঝে পার্থক্য কোথায় বলুুন তো? হ্যা, ক্রিটিক্যাল থিংকিং। সমস্যার সমাধান নিয়ে চিন্তা করার পাশাপাশি সমাধান করাও গুরুত্বপূর্ণ।

জীবনের সব জায়গায় নিত্য নতুন সমস্যার সৃষ্টি হবেই। কিন্তু সমস্যা সমাধানের মতো স্কিল আপনাকে অন্যান্য কর্মীর চেয়ে আলাদা করে দিবে।

৫) পাবলিক স্পিকিং

চাকরি-স্কিল

পরিসংখ্যান বলে, অধিকাংশ মানুষ মৃত্যুর চেয়েও পাবলিক স্পিকিংকে বেশি ভয় পায়। মনে রাখবেন ভাল স্পিকার একজন ন্যাচারাল লিডার, যেকোন নতুন জায়গায়ও খুব কম সময়ের মধ্যেই তিনি নিজের অবস্থান সৃষ্টি করতে পারেন।

আপনি যদি পাবলিক স্পিকিং এ কম্ফোর্টেবল না হন, তবে ক্যারিয়ার উন্নতিতে বাধা হয়ে দাড়াবে। Warren Buffett এর মতে পাবলিক স্পিকিং কোয়ালিটি কোন কর্মীর ৫০% ভ্যালু বৃদ্ধি করতে পারে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন পাবলিক স্পিকিং সক্ষমতা ক্যারিয়ারের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

৬) অ্যাডাপ্টেশন অ্যাবিলিটি :

জগতের কোন কিছুই স্থিতিশীল কিংবা অপরিবর্তনশীল নয়। এ জগতে পরিবর্তনই নিয়ম। জীবনে তারাই উন্নতি করে যারা পরিবর্তনের সাথে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে। চাকরি দাতাদের এমন কর্মীদের প্রয়োজন যারা যেকোন নতুন চ্যালেঞ্জের সাথে মানিয়ে নিতে পারে, নতুন টিম মেম্বারদের সাথে দ্রুত বন্ধুত্ব করতে পারে এবং নতুন আইডিয়া গ্রহণ করতে পারে।

পরিবর্তন যত খারাই হোক না কেন সবকিছুকে জীবনের জন্য পজিটিভ হিসেবে বিবেচনা করলে মানিয়ে নেওয়া সহজ হবে। চাকরি থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণেই হয়তো আপনি জীবনের সবচেয়ে ভাল চাকরিটা পেয়ে যাবেন কিংবা কোন মারাত্মক ভুল করার ফলে নতুন কোন স্কিল ডেভলপ করার সুযোগ পাবেন।

এসব দক্ষতা আপনার নতুন দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা এবং যোগ্যতার প্রমাণ দেয়। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পজিটিভ থাকতে হবে, সেই সাথে পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার সফট স্কিল।

৭) সেলফ কন্ট্রোল :

বিবেক এবং আবেগের মাঝে সবসময়ই ঠান্ডা লড়াই চলতে থাকে। মানুষ আবেগের উর্ধে নয়। কিন্তু যে আবেগ কন্ট্রোল করতে পারে না তিনি প্রায়শই ঝামেলায় পরেন।

আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বিয়ে ভাঙ্গা থেকে শুরু করে, কর্ম জীবনে সমস্যা এমনকি এই আবেগের প্ররোচনার কারণে অনেকের জেল জরিমানা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

নিজের উপর কন্ট্রোল রাখার সফট স্কিল জীবনকে অনেক ঝামেলা থেকে দূরে রাখতে পারে এবং অপরের কাছে আরো বেশি গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

সফট স্কিল কিভাবে ডেভলপ করা যায়

ইন্টারভিউ কিংবা কর্মক্ষেত্রে দুজনের মাঝে পার্থক্য তৈরি করতে পারে সফট স্কিল। যদি বৈশিষ্ট্যগুলো আপনার মাঝে প্রাকৃতিকভাবে না আসে তবে প্রাথমিকভাবে কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারেন উদাহরণস্বরূপ, আরো ধৈর্য্যশীল হওয়া কিংবা ভাল শ্রোতা হওয়ার চেষ্টা করা, এর অর্থ এই নয় যে এগুলো সহজ।

সফট স্কিল বৃদ্ধি করার বিভিন্ন বই, আর্টিকেল পড়ে কিংবা ভিডিও দেখে নিয়মিত চেষ্টা করতে থাকুন এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করুন। স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করা পর্যন্ত পাবলিক স্পিকিং এর মতো স্কিলগুলো আয়নার সামনে কিংবা ঘরেই চেষ্টা করুন।

শেষ কথা

উপরের সফট স্কিলসগুলো ক্যারিয়ারে উন্নতির পাশাপাশি আপনার জীবনে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজে লাগবে। তাই soft skills ভালভাবে ডেভেলপ করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিন। যেসব দক্ষতা ইতিমধ্যে আপনার রয়েছে সেগুলোয় কোন দূর্বলতা থাকলে তা খুঁজে বের করে উন্নতি করার চেষ্টা করুন, তাহলে পারফরম্যান্সও বৃদ্ধি হবে

নিজের মধ্যে উপরে উল্লিখিত সফট স্কিলগুলো ডেভলপ করার পর নিজেই নিজের পারিপার্শ্বিক, সামাজিক এবং কর্ম জীবনের পরিবর্তনগুলো উপলব্ধি করতে পারবেন।


Abdullah

বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদে অধ্যয়নরত। জানার আগ্রহ থেকে whyorwhen এবং Pratiborton এ লেখালেখি করি।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।