আপনাকে যদি কেউ এখন বলে আপনি নিজেই আপনার চোখের ক্ষতি করছেন। তাহলে কথাটি নিশ্চয়ই আপনি বিশ্বাস করতে চাইবেন না। আপনার মতো আমিও প্রথমে বিষয়টি শুনে ভড়কে গিয়েছিল! কারণ আপনার আমার ধারণা মতে আমাদের হাতে থাকা ডিভাইস, দূষিত পরিবেশ, ধুলোবালি এবং সর্বোপরি বাহ্যিক পরিবেশ আমাদের চোখের ক্ষতি করছে। তবে, এক্ষেত্রে আমাদের ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়।

মূল বিষয়টি হলো, আপনার অসচেতনতা আপনার চোখের ক্ষতি করছে। এখন নিশ্চয়ই ভাবছেন কিভাবে?

তাহলে প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক ব্লু লাইট বা নীল আলো সম্পর্কে।

নীল আলো বা ব্লু লাইট ( Blue Light ) কী?

আপনি খালি চোখে আলোর দিকে তাকালে স্বাভাবিক অবস্থায় সাদা রঙের আলো দেখতে পারবেন। আলোর সাত রঙের কথা আপনার নিশ্চয় মনে আছে?

এই সাতটি রং যদি একত্রে আলো তৈরি করে তবে তা সাদা রঙের দেখায়। সাত রঙা এই আলোতে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য থাকে।

ছেলেবেলা থেকেই আলোর সাতটি রংয়ের সাথে আমরা পরিচিত। আলোর সাত রঙা রূপটি দেখা যায় রংধনুর বিচিত্রময় আলোক ছটায়।

এই সাতটি রঙের আলোর মধ্যে নীল রঙের আলোও থাকে। যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম কিন্তু অধিক শক্তি নির্গত করে।

দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি জিনিসই পরিমাপ করা হয় মিটার, কেজি বা লিটার ইত্যাদি পরিমাপে। ঠিক তেমনি যে আলো আমাদের চোখে এসে পৌঁছায়, এই আলোর পরিমাপ করা হয় ন্যানোমিটার হিসাবে।

অর্থাৎ সাতরঙা এই আলোর প্রতেকটির আলাদা আলাদা তরঙ্গদৈর্ঘ্য আছে এবং প্রত্যেকটি আলোর ধর্ম আলাদা।

আপনি জেনে অবাক হবেন যে আলোর সাতটি রংয়ের মধ্যে নীল আলোর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। আরো সহজ ভাষায় বললে, দৃশ্যমান আলোর তিনভাগের এক ভাগ শুধু ভাগ নীল আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য দখল করে থাকে।

হার্ভার্ড এর প্রকাশিত স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য মতে, আমাদের ডিভাইস গুলোতে ব্যবহৃত এলইডি লাইটে ব্লু লাইট বা নীল আলো থাকে। এটি আমাদের চোখের জন্য ক্ষতিকর এবং আমাদের ঘুম নিয়ন্ত্রণ করে।

তাছাড়া ঘুমের সমস্যা, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, চোখে ছানি পড়া, উচ্চ রক্তচাপ এবং চোখের পানি শুকিয়ে যাওয়ার মতো অনেক সমস্যা তৈরি করে। যা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

এই সমস্যাগুলো সমাধানের উপায় ব্লু লাইট বা নীল আলোর ব্যবহার কমিয়ে দেওয়া। সূর্যের আলোতেও ব্লু লাইট থাকে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আপনার প্রশ্ন থাকতে পারে যে, সূর্যের আলো থেকে ডিভাইসের লাইট গুলো বেশি ক্ষতিকর কেন?

সূর্যের আলো এবং নীল আলো

সূর্যের আলো দিনের বেলা থাকলেও রাতে সূর্যের আলো থাকেনা এবং দিনের বেলায় সূর্যের আলো সরাসরি আমাদের চোখে পড়ে না।

অপরদিকে আমরা যখন আধুনিক ডিভাইস ব্যবহার করি। তখন ডিভাইসের আলো সরাসরি আমাদের চোখে পড়ে এবং চোখের ক্ষতি করে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়।

অথচ দিনের বেশিরভাগ সময় আপনাকে আপনার দৈনন্দিন কাজের জন্য এইসব ডিভাইসের উপর নির্ভর করতে হয়। আজকাল আধুনিক যুগের সাথে তাল দিয়ে ডিভাইস এর ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তাছাড়া আপনি যদি একজন লেখক হন, তাহলে আপনি নিশ্চয়ই লেখালেখির কাজে ডিভাইস ব্যবহার করে থাকবেন। অফিস-আদালতের বিভিন্ন কাজে কম্পিউটার, ল্যাপটপ ব্যবহার করা হয়। এই অধিক সময় ডিভাইস ব্যবহারের ফলে আপনার চোখের ক্ষতি হতে পারে।

সুতরাং, এসব সমস্যা থেকে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান পেতে, ভালমানের নীল আলো প্রতিরোধক একটি চশমা আপনার জন্য উপযোগী হতে পারে।

নীল আলো প্রতিরোধী চশমা বা ব্লু কাট লেন্সের কাজ

ব্লু কাট লেন্স

ব্লু কাট লেন্স যেভাবে নীল আলো প্রতিরোধ করে

সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস (মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, টেলিভিশন ইত্যাদি) নীল আলো নির্গমন করে। অথচ দৈনন্দিন কাজ থেকে শুরু করে অফিসিয়াল কাজেও বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করতে হচ্ছে।

তাছাড়া দিনের অধিকাংশ সময় আপনি যখন হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাট করা, ফেসবুক নোটিশফিকেশন চেক করা বা কোনো গেম নিয়ে ব্যাস্ত, তখনও আপনার চোখ বিরতিহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

আপনার এই মূল্যবান চোখদুটো রক্ষা করার জন্য ব্লু কাট লেন্স ( Blue cut lens ) ব্যবহার করতে পারেন।

ব্লু কাট লেন্সগুলোতে একটি বিশেষ আবরণ থাকে, যা ডিজিটাল ডিভাইসগুলোর নীল আলো প্রতিফলিত করে, যাতে এই ক্ষতিকর রশ্মি লেন্সগুলির মধ্য দিয়ে যেতে বাধা পায়। ব্লু কাট লেন্সগুলো ইউভি রশ্মি থেকে ১০০% সুরক্ষা দেয় এবং চোখের জ্বালা ভাব দূর করে।

বাংলাদেশে নীল আলো প্রতিরোধী চশমার দাম

কোন জিনিস কেনার আগে জিনিসটি সম্পর্কে মৌলিক কিছু ধারণার প্রয়োজন পড়ে। আর তাই আপনার সুবিধার জন্য কয়েকটি ব্লু কাট চশমা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য জানাব।

ব্লু ব্লকিং চশমাগুলোর দাম বাংলাদেশী টাকায় ১০০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ২০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

অ্যারেন ব্লাক, ক্রোনস ইয়লো এই দামের দিক বিবেচনায় প্রায় একই বাজেটের মধ্যে মোটা ফ্রেমের ব্লু ব্লকিং চশমা।

গোল আকৃতির স্মার্ট দেখতে এই চশমা শূন্য পাওয়ারের এবং বাজেটের মধ্যেই বেশ ভালো মানের হবে।

তবে ক্রোনস ইয়লো পুরোপুরি হলুদ রঙের হলেও অ্যারেন ব্লাক নীল এবং কালো রংয়ের মিশেলে তৈরি। এডিসন এবং ইভানটিক ব্লাক স্টেইলেস স্টিলের তৈরি চিকন ফ্রেমের চশমা।

এই ব্লু ব্লকিং চশমাগুলোর আকার গোল তবে চশমার কাঁচের রঙে কিছুটা তারতম্য লক্ষ্য করতে পারবেন।

ব্লু ব্লকিং চশমার তালিকায় এক্সেল লিওপার্ড এবং হোরাস ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। আপনি খেয়াল করলে নিজেই বুঝতে পারবেন যে, চশমা দুটো একেবারে সাদাসিধে গড়নের এবং ব্লু ব্লকিং ও ইউভি রশ্মি প্রতিরোধক উভয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

এমনকি হোরাস ব্লু ব্লকিং, ইউভি নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পাওয়ার বাড়ানো কমানোর সুবিধা রেখেছে। বাইরের অতিবেগুনি রশ্মি এই চশমার কাচে পড়ার পর চশমার গ্লাস সাময়িক সময়ের জন্য নিজে থেকেই কালো রং ধারণ করে। অর্থাৎ আপনি একই দামে দুটো সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।

তাছাড়া অ্যানিভিয়া, ওয়ার্ডন, অ্যানিগমা লিওপার্ড, তাহিতি ভিন্ন ধরনের ডিজাইন এবং রঙের তৈরি মোটা এবং মাঝারি ফ্রেমের চশমা। অ্যাস্টার ট্রান্সপারেন্ট হালকা বেগুনি রঙের, চারকোনা ডিজাইনে তৈরি ব্লু ব্লকিং চশমা।

অপরদিকে প্যাটিনসন ট্রান্সপারেন্ট একই ডিজাইনের পুরোপুরি সাদা রঙের চশমা।

সুতরাং এবারে আপনার কাজটি হচ্ছে পছন্দ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আপনার নির্ধারিত বাজেটের ভেতর জুতসই চশমার মালিক বনে যাওয়া।

ব্লু লাইট ফিল্টার

ব্লু লাইট ফিল্টার কিছু ক্ষেত্রে আপনি সমাধানের জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্লু লাইট ফিল্টার অ্যাপ বা ডার্ক মোড ব্যবহার করতে পারেন। এমনকি আপনার এন্ড্রয়েড ফোনের সেটিংস থেকে ব্লু লাইট ফ্লিল্টার অপশন চালু করে কাজ করতে পারেন। তাতে কিছু সময়ের জন্য নিজের চোখকে বড় রকমের ক্ষতির থেকে সুরক্ষা দিতে পারবেন।

কম্পিউটারেও বর্তমানে Eye Saver এর মাধ্যমে ডার্ক মোড চালু করা যায়।

সতর্কতা

  • অনেকসময় কিছু দোকানদার সাধারণ মানের চশমাগুলোকে ব্লু ব্লকিং চশমা হিসেবে বিক্রি করতে পারেন। সুতরাং, নিজের চশমা কেনার আগেই সতর্ক হয়ে নেবেন যেন তা ব্লু ব্লকিং গুণসম্পন্ন হয়।
  • চশমার নিম্নমানের গ্লাসের ব্যাপারে আগেভাগেই সাবধানতা অবলম্বন করুন।
  • যেকোনো পাওয়ার চশমা ব্যবহারের আগে ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন।
  • চশমাটি কেনার পূর্বে বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন। একই চশমা অনেকে ব্যবহার করবেন না, তাতে চশমার ফিটিংস নষ্ট হয়ে যায়।

পরিশেষ

সর্বোপরি আপনার সতর্ক পদক্ষেপ আপনার চোখের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আপনার দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে চোখ যেহেতু সবসময় আপনাকে সাহায্য করে। সেহেতু আপনার উচিত চোখের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা।

পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম এবং খাবার-দাবারের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। অনেকসময় ভিটামিনের অভাবে চোখ বিভিন্ন রোগে ভোগে বা নষ্ট হয়ে যায়। নিজের সাধ্যের মধ্যে ব্লু লাইট প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করতে পারেন। এতে আপনার চোখ কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আপনার সুস্বাস্থ্য এবং মঙ্গল কামনা আমাদের মূখ্য উদ্দেশ্য।

সুতরাং আর দেরী না করে চোখের যত্নে কিনে ফেলুন একটি ব্লু ব্লকিং বা নীল আলো প্রতিরোধক চশমা।


Mabia maria

জীবনের প্রতিটি ধাপেই শিখতে চাই। পথে হাজার বার হোঁচট খেতে চাই, যেন আবার নতুন উদ্যম আর অভিজ্ঞতা নিয়ে জীবনের দুর্গম পথগুলি পেরিয়ে যেতে পারি।প্রত্যেকর নিজস্ব একটা ভাষা থাকে, আমার ভাষা কলম।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 − one =

error: Content is protected !!