প্রেজেন্টেশন বা উপস্থাপনা– যেকোন একটি বিষয়কে সুন্দর ও রুচিশীল ও শ্রুতিমধুর ভাবে তথ্যবহুল বিশ্লেষণকে বা তুলে ধরাকেই প্রেজেন্টেশন বা উপস্থাপনা বলে।

কিন্তু এই নিয়ে যেন আতংকের শেষ নেই। ভীতির আরেক নাম যেন এই প্রেজেন্টেশন। অনেক মেধাবী আর দক্ষতাসম্পন্ন মানুষও যেন এই কাজে এসে একদম শিশুর মত ভয় পেয়ে উঠেন। কাঁপতে থাকে হাত পা। ঘামতে থাকে নাক মাথা।

শিক্ষা বা কর্মস্থলে এটি ছাড়া চলা প্রায়ই অসম্ভব। প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়ের বাজার এবং সৃজনশীল ধারার শিক্ষাব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ যেন এই প্রেজেন্টেশন  অফিস কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজকাল সবখানেই এই প্রেজেন্টেশন দক্ষতার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে।

ছাত্রদের পরীক্ষার সাথেও এই প্রেজেন্টেশন সম্পৃক্ত আর অফিসে বিশেষ করে কর্পোরেট কোম্পানি গুলোতে তো রীতিমত এই দক্ষতাকেই অধিক মূল্যায়ন করা হয়।কিন্তু অনেকেই প্রচেষ্টা করেও যেন বারবার হেরে যাচ্ছেন নিজের ভীতির কাছে।

প্রেজেন্টেশন নিয়ে কেন এত ভয় ?

মানুষ যে কারণে সবার সামনে কথা বলতে ভয় পায় তা হলো অনিশ্চয়তা।এককথায় বলতে গেলে আমরা জানিনা বক্তৃতা বা প্রেজেন্টেশনের সময় কি ঘটবে। ভয়ের কারণটা নিশ্চয়ই এমন নয় যে আপনাকে এমন একটা বিষয়ে বলতে হবে বা প্রেজেন্টেশন করতে হবে হবে সে বিষয় সম্পর্কে আপনি কিছুই জানেন না।
কারণটা হচ্ছে আপনি যখন কিছু বিষয়ে বলতে শুরু করবেন সেই বিষয় নিয়ে অনিশ্চয়তা কাজ করছে। বক্তার অনিশ্চয়তায় ভোগার মত অনেক কারণ থাকতে পারে যেমন সবাই বক্তার আইডিয়া কিভাবে গ্রহণ করবে ?
কিভাবে মুল্যায়িত হবে অথবা শ্রোতা কতটুকু প্রভাবিত হবে? যদি ভুল বলে ফেলি? যদি কেউ কথা শুনে হাসতে শুরু করে? এই ভয়েই থাকেন অধিকাংশ মানুষ। মূলত মানবপ্রকৃতিতে নেতিবাচক চিন্তার আধিক্য বেশি থাকে বলেই উপস্থাপনার আগে এই রকম ভয় ভীতি সংশয় কাজ করে।
সকল কাজে সফল হতে গেলে কিছু নিয়ম পালন করতে হয় কিন্তু তার সাথে দরকার ইতিবাচক মনোভাব যেটা না থাকলে মূলত সকল নিয়ম মেনেও কাজে সফলতা আনা সম্ভব হয়না।
আজ তাদের জন্যই নিয়ে এলাম এমন ১০ টি অস্ত্র যার প্রয়োগ আপনার অন্তরের উপস্থাপনা ভীতিকে বধ করবে ইন্দ্রের দেবতার অব্যর্থ বাসবী শক্তির মত। আর আপনার উপস্থাপনা হবে নিখুঁত ও দৃষ্টিনন্দন ও শ্রুতিমধুর

১)  উপস্থাপনার বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত ভাবুন বা জানুন

বিষয়টি নিয়ে জ্ঞান থাকলে একটু ভাবুন আর জানা না থাকলে একটু ঘাটুন মুখস্ত করার চাইতে বুঝার চেষ্টা করুন আসলে ব্যাপার টি কি। বিস্তারিত জানুন আর সকল বিষয়ের সারাংশ মাথায় নিয়ে তথ্যবহুল সুন্দর মিশ্রণ তৈরী করুন। যাতে স্বল্প কথায় বিষয়টি বেশ সুন্দর করে ফুটে উঠে।
এটি আপনি তখনই করতে পারবেন যখন আপনি বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত ঘাটাঘাটি করবেন আপনি যত বেশি জানবেন ততোই বিষয়টি সহজভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন তাই বিষয়টি নিয়ে রিসার্চ করুন

২) পরিকল্পনা প্রণয়ন

এবার আপনার প্রেজেন্টেশন এর জন্য বিষয়টি ঘিরে একটি পরিকল্পনা বানান। কয়েকটি ধাপ তৈরী করুন।  একসাথে সব ভাবতে গেলে ব্রেইন এলোমেলো হয়ে যাবে তাই প্রারম্ভ / বিষয়ের সাধারন ধারনা, আজকের বক্তব্যের সাথে বিষয়ের সম্পৃক্ততা / বিষয় সম্বন্ধীয় তথ্য/ উপসংহার। এরকম ভাবে পয়েন্ট করে একটি ধারা প্রস্তুত করুন।
সেগুলা মনে রাখলে বলার সময় সিরিয়ালি মাথায় আসবে। বিষয়কে ধাপে ধাপে যত ভাগ করবেন ততোই তা মাথায় সহজে ঢুকবে। বাচ্চাদের পড়া মুখস্ত করার বেলায়ও এই টেকনিক ব্যবহার করা হয়। এতে আপনার ব্রেইন আলাদা আলাদা ভাবে পরিকল্পনা বুঝতে পারবে। আর সেগুলো ঠিক ভাবে জোড়া লাগিয়ে বলতে পারলেই আপনার প্রেজেন্টেশন এর কাঠামো সুন্দর ভাবে দাঁড়াবে।

৩) পরিমিত তথ্য ও শ্রুতিমধুর শব্দে টপিকটি সাজান

এক তরফা তথ্য দিয়ে বিরক্তির কারন হওয়ার দরকার কি? আবার তথ্য ছাড়াও কি প্রেজেন্টেশন হয়? তাই শ্রুতিমধুর শব্দ আর বাচনভঙ্গির সাথে যুক্ত করুন পরিমিত তথ্য। কাঠামোর প্রতিটি ধাপকে তথ্য ও বাক্য দিয়ে একটি শর্ট স্ক্রিপ্টে রুপ দিন যার বিস্তারিত বক্তা হবেন আপনি।

৪) চর্চা করুন

ইংরেজিতে একটা কথা আছে  Practice makes a man perfect আসলেই যে কোন কাজে চর্চা না থাকলে দক্ষতা হ্রাস পায়। তেমনিভাবে প্রেজেন্টেশন এর আগে চর্চা করুন। তবে মুখস্ত নই নিজের মত করে।  এতে আপনার উচ্চারণ এর ভুল সমূহ ধরা পড়বে আর আপনার মস্তিস্ক আপনার পরিকল্পনা বুঝতে পারবে।

৫) আয়নার সামনে উপস্থাপন করুন

প্রেজেন্টেশনে কেবল কথা দিয়ে হয়না এটিকে সুন্দর করতে দরকার সঠিক বাচনভঙ্গি ও মুখভঙ্গি তাই এগুলোর ঠিক করতে আপনি আয়নার সামনে গিয়ে প্র‍্যাক্টিস করুন এতে করে আপনি এই বিষয় গুলা ঠিক করে নিতে পারবেন বুঝতে পারবেন নিজের ভুল আর নিজের ত্রুটি। এই জিনিস গুলো হয়ত খুবই ছোট কিন্তু প্রেজেন্টেশনকে সুন্দর করতে এগুলো বিশাল ভূমিকা পালন করে

৬)  ফরমাল পোশাক পরুন

একজন উপস্থাপক যেহেতু দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন সেহেতু তার খুঁটিনাটি সকল বিষয়ের দিকে নজর রাখা আবশ্যক।  তেমনই হলো এই পোশাক নির্বাচন। শাট প্যান্ট সুট আপনার লুককে করে তুলবে আরো আকর্ষণীয়। তাই অবশ্যই নিজের পোশাক নির্বাচনে রুচিশীলতার পরিচয় দিন

) দিনটি আজকে আপনার সফলতার জন্য

আজকের দিন টা আপনার জন্য সবাই আজকে বসে আছে আপনার সফলতা দেখার জন্য।  একমাত্র যোগ্য কেউ থাকলে আপনিই আছেন এই ভেবে নিশ্বাস নিন।
সামনে যারা আছে এরা কেউই আপনার চেয়ে বেশি বলতে পারবেনা সবাই আজ আপনার থেকে শিখবে আজ আপনার নিজেকে প্রমানের দিন।  এরপর তেজোদৃপ্ত ভাবে এগিয়ে যান বলার জন্য।
 

৮) বড় করে নিশ্বাস গ্রহন করুন

আমাদের মস্তিস্ক যখন ভীত হয়ে উঠে তখন আমাদের ব্রেইনে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ হয়না তাই উপস্থাপনা কিছুই নয় এই বিষয় মাথায় রেখে বড় করে নিশ্বাস নিয়ে আগে নিজেকে শান্ত করুন। এতে আপনার মস্তিস্কের উত্তেজনা কমে আসবে। আপনি ইতিবাচক ভাবনায় সাড়া পাবেন।
ব্রেইনকে কন্ট্রোলে রাখা খুব কঠিন কাজ সেটা আপ্নি তখনই সম্পন্ন করতে পারবেন যখন আপনার ভীতির চাইতে সফল উপস্থাপক হওয়ার জন্য মনের জোর বেশি থাকবে।

৯) নিজের চারদিকে তাকান এবং নিজেকে কম্ফোর্ট ফিল করান

চারদিকে তাকান ভাবুন এরা সকলে আপনার আপন এরা শিখছে আর আপনি শিখাচ্ছেন। সকলে আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী সকলে আপনার মনোবল যোগাতে এখানে উপস্থিত। এদের সামনে ভুল হলেও লজ্জার কিছু নেই।
মানুষ জীবনের প্রতি পদক্ষেপেই শিখতে থাকে এই মানসিকতা বহন করে যখন ভাববেন দেখবেন চারপাশটা আপনার ঘরের মত মনে হচ্ছে সাম্নের সকল্কে আপন মনে হচ্ছে তখন আপনার কাছে ব্যাপারটা অনেক সহজ মনে হবে।

১০) কথায় আটকে গেলে চুপ থাকুন আর ভাবুন-

অনেকে আটকে গেলে কথায় আর্টিকেল যুক্ত করেন ( আ,  উউ)  এসব করকে শ্রোতারা বিরক্তবোধ করবে। তাই কোথাও আটকে গেলে চুপ থাকুন আর মনে করার চেষ্টা করুন। অপ্রয়োজনীয় শব্দ করে বলার গতি নষ্ট করার চাইতে চুপ থেকে আবার বলা ভালো।
চাইলে চুইংগাম চিবোতে পারেন এতে আপনার ব্রেইন অন্য কিছু ভাবতে পারবে না সে অন্য দিকে ব্যস্ত থাকবে আর এদিকে আপনার চেতন মন নিজেকে প্রস্তুত করবে
এভাবে যদি সঠিক ভাবে করতে পারেন তবে অবশ্যই একজন ভাল উপস্থাপক হওয়া আপনার জন্য সময়ের অপেক্ষা মাত্র। তবে আপনার দিক থেকে থাকতে হবে ভাল প্রেজেন্টেশন বা উপস্থাপনা করার অদম্য ইচ্ছাশক্তি। আপনি পারবেন আপনাকে দিয়েই হবে আপনি এটির জন্যই জন্মেছেন এইরুপ মানসিকতা বহন করে চলতে পারলে অবশ্যই আপনি খুব ভাল একজন উপস্থাপক হবেন। শুভ কামনা রইলো।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।