বর্তমান বিশ্বে থ্যালাসেমিয়া একটি মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষই এতে আক্রান্ত হচ্ছেন বহুলাংশে।  অনেকেই থ্যালাসেমিয়া রোগটির নাম শুনে থাকলেও হয়ত জানেননা যে এই রোগটি ঠিক কি কারণে হয় এবং থ্যালাসেমিয়া প্রতিকারে করণীয় কি। বাংলাদেশের কিছু এলাকায় ব্যপক আকারে থ্যালাসেমিয়ার প্রকোপ দেখা দিয়েছে।

অনেকেই থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে না জানার কারণে ভেবে থাকেন, এটি হয়তো ছোয়াচে রোগ, আক্রান্ত ব্যক্তি হয়তো বিয়ে করতে পারবেন না, কিংবা তার বেঁচে থাকার সম্ভাবণাও নেই। এসবই আমাদের ভুল ধারণা।

Thalassemia সম্পর্কে যারা সঠিক তথ্য জানতে চান, তাদের জন্যেই আজকের এই আর্টিকেলটি।

থ্যালাসেমিয়া কি?

থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) মূলত উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত একটি রক্ত সংক্রান্ত রোগ। এর কারণে দেহে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় হ্রাস পেতে থাকে।

মানবদেহে হিমোগ্লোবিনের গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা সকলেই অবগত। হিমোগ্লোবিন (hemoglobin) নামক প্রোটিনজাত অণুটি লোহিত রক্তকণিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি লোহিত রক্তকণিকাকে অক্সিজেন বহনে সাহায্য করে।

যখন মানবদেহে হিমোগ্লোবিন হ্রাস পেতে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই দেহে অক্সিজেন পরিবহনের মাত্রা কমতে থাকে। এর ফলে অ্যানেমিয়া (anemia) বা রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।

অ্যানেমিয়া এমন একটি রোগ যা দেহের স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর লোহিত রক্তকণিকার অভাবে হয়। এর মূল লক্ষণ ক্লান্তি বা অবসাদ এবং শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যা।

বলে রাখা ভালো, থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে অ্যানেমিয়া (রক্তস্বল্পতা রোগ) প্রচ্ছন্ন বা প্রকট দুইরূপেই দেখা দিতে পারে। তবে প্রকটভাবে আক্রান্ত অ্যানেমিয়ার কারণে দেহের অঙ্গ বিকৃতি ছাড়াও মৃত্যুও দেখা দিতে পারে।

থ্যালাসেমিয়ার কারণ

১। প্রথমত, থ্যালাসেমিয়া মূলত একটি বংশগত রোগ। এটি তখনই হয়, যখন কোন মানুষ তার পিতামাতার থেকে পরিবর্তিত জিনের অধিকারী হন।

এই পরিবর্তিত জিনই রক্তের হিমোগ্লোবিন পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক হ্রাসের মূল কারণ। সুতরাং বলা যায় যে, কোন শিশু জন্মগতভাবেই থ্যালাসেমিয়ার অধিকারী হতে পারে।

২। দ্বিতীয়ত, যে সকল কোষ মানবদেহে হিমোগ্লোবিন তৈরি করে, তাদের ডিএনএ (DNA) এর অস্বাভাবিক মিউটেশনের কারণেই থ্যালাসেমিয়া হয়ে থাকে।

থ্যালাসেমিয়া কাদের হয়

১। পিতা ও মাতা উভয়ই থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হয়ে থাকলে তাদের সন্তানের ক্ষেত্রেও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। থ্যালাসেমিয়া প্রকট বা প্রচ্ছন্ন কিনা তা নির্ভর করে পিতামাতা উভয়ের থেকে প্রাপ্ত অস্বাভাবিক জিনের অনুলিপির উপর।

সাধারণত উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ দুই বা ততোধিক অস্বাভাবিক জিনের অনুলিপি প্রাপ্ত হলে তার প্রকট কিংবা প্রচ্ছন্ন- দুইরকম থ্যালাসেমিয়াই হতে পারে।

তবে হ্যাঁ, পিতা ও মাতা উভয়ের যেকোন একজন যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তাহলে তাদের সন্তান থ্যালাসেমিয়া মাইনর (thalassemia minor) এ আক্রান্ত হতে পারেন। এক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণসমূহ তেমন প্রকটভাবে দেখা না দিলেও সন্তানটি একজন থ্যালাসেমিয়া বাহক বলে গণ্য হবেন।

সুতরাং বলা যেতে পারে যে, কারো পিতা ও মাতা উভয়েই থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হলে তাদের সদ্যজাত সন্তানটিও থ্যালাসেমিয়ার আতঙ্কমুক্ত নয়।

২। থ্যালাসেমিয়া শুধু বংশগত বা জন্মগতই নয়, বরং জাতিগতও বটে। এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এমনকি গ্রীস বা তুরষ্কের মত ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অধিবাসীরাই থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হন বেশি।

থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ

থ্যালাসেমিয়ার ধরণ ও প্রকারভেদের উপর ভিত্তি করে এর লক্ষণ ও উপসর্গগুলো দেহে দেখা দেয়। যেমনঃ

১। মাত্রাতিরিক্ত ক্লান্তি ও অবসাদ

২। শারীরিক দুর্বলতা

৩। ফ্যাকাশে বা হলদেটে ত্বক

৪। মুখের হাড়ের বিকৃতি

৫। মূত্রবর্ণ গাঢ় হওয়া

৬। বিলম্বিত দৈহিক বৃদ্ধি ও বিকাশ

৭। অ্যাবডোমিনাল সোয়েলিং (Abdominal swelling) অর্থাৎ পেট ফুলে যাওয়া

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে তাদের জন্মের পরপরই থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণগুলো দেখা দেয়, আবার কেউ কেউ জন্মের দুই বছরের মাথায় থ্যালাসেমিয়ার উপসর্গপ্রাপ্ত হন। আবার বয়ঃসন্ধিকালেও থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণসমূহ বেশ প্রকটাকার ধারণ করে।

থ্যালাসেমিয়ার প্রকারভেদ

থ্যালাসেমিয়ার প্রকারভেদ সম্পর্কে জানার আগে আমাদের দরকার হিমোগ্লোবিন সম্পর্কিত কিছু বিশদ জ্ঞান। হিমোগ্লোবিন অণুসমূহ দুই ধরণের চেইন দ্বারা গঠিত- আলফা চেইন (alpha chain) এবং বিটা চেইন (beta chain)। জেনেটিক মিউটেশনের মাধ্যমে এই আলফা এবং বিটা চেইনের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়লেই থ্যালাসেমিয়া হয়ে থাকে।

হিমোগ্লোবিনে আলফা এবং বিটা- উভয় চেইনের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার উপর ভিত্তি করে থ্যালাসেমিয়া রোগটি মূলত দুই প্রকারের হয়ে থাকে। যথা:

১। আলফা থ্যালাসেমিয়া (alpha-thalassemia)

২। বিটা থ্যালাসেমিয়া (beta-thalassemia)

আসুন জেনে নেই আলফা থ্যালাসেমিয়া ও বিটা থ্যালাসেমিয়ার কারণগুলো কি কি।

১। আলফা থ্যালাসেমিয়া

পিতা মাতা থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত মিউটেটেড জিনের সংখ্যার উপর আলফা থ্যালাসেমিয়ার প্রকটতা নির্ভর করে। মিউটেটেড বা পরিবর্তিত জিনের সংখ্যা যত বেশি, আলফা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও তত বেশি।

এখন, আলফা হিমোগ্লোবিন চেইন তৈরিতে চারটি জিন অংশ নিয়ে থাকে। পিতা ও মাতা উভয়ের থেকে একজন সন্তান দুটি করে জিন পেয়ে থাকেন।

থ্যালাসেমিয়া জেনেটিক রোগ

চিত্রসূত্র- উইকিপিডিয়া

সন্তান যদি একটিমাত্র পরিবর্তিত জিনের অধিকারী হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে তার দেহে থ্যালাসেমিয়ার কোন উপসর্গ পরিলক্ষিত হবেনা। তবে হ্যাঁ, তিনি থ্যালাসেমিয়ার একজন বাহক হবেন এবং পরবর্তীতে তার সন্তানেরা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

অপরদিকে, সন্তান দুইটি মিউটেটেড বা পরিবর্তিত জিনপ্রাপ্ত হলে লক্ষণসমূহ তেমন প্রকট হবেনা, বরং প্রচ্ছন্নরূপেই দেহে পরিলক্ষিত হবে। এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে আলফা-থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট (alpha-thalassemia trait) বলা হয়।

পক্ষান্তরে, তিনটে মিউটেটেড জিনের অধিকারী সন্তানদের ক্ষেত্রে উপসর্গসমূহ অনেক প্রকট হয়। এই অবস্থাকে হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজ (hemoglobin H disease) বলা হয়ে থাকে।

এছাড়াও, জিন মিউটেশন ছাড়াও তিনটি আলফা হিমোগ্লোবিন জিন অনুপস্থিত থাকলেও হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজ হবার সম্ভাবনা গুরুতর।

হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজের কারণে যেসকল শারীরিক জটিলতা দেখা দেয় তা নিম্নরূপ:

১। জন্ডিস

২। অতিরিক্ত বর্ধিত প্লীহা

৩। অপুষ্টি

৪। হাড়ের সমস্যা

৫। চোয়াল, কপাল ও গাল বড় হওয়া

সাধারণত উত্তরাধিকারসূত্রে চারটে মিউটেটেড বা পরিবর্তিত জিনের অধিকারী হওয়া বেশ বিরল একটি ব্যাপার। এই অবস্থাকে হাইড্রপস ফ্যাটালিস (Hydrops fetalis) বলা হয়। এক্ষেত্রে জিনগুলোর মিউটেশন ছাড়াও চারটি আলফা গ্লোবিন জিনের অনুপস্থিতিও দেখা দিতে পারে।

যেসব শিশুরা চারটি মিউটেটেড জিন নিয়ে জন্ম নেয়, তারা সচরাচর জন্মের পরপরই মারা যায়। আর কোনভাবে তারা বেঁচে গেলেও তাদের জন্য আজীবনমেয়াদী ট্রান্সফিউশন থেরাপির (transfusion therapy) প্রয়োজন হয়।

কিছু বিরল ক্ষেত্রে ট্রান্সফিউশন থেরাপির পাশাপাশি স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট (stem cell transplant) এর মাধ্যমেও তাদের চিকিৎসা করা হয়।

২। বিটা থ্যালাসেমিয়া

আলফা থ্যালাসেমিয়া থেকে বিটা থ্যালাসেমিয়া কারণগত দিক হতে একটু ভিন্ন। বিটা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে, থ্যালাসেমিয়ার তীব্রতা নির্ভর করে হিমোগ্লোবিন অণুর ঠিক কোন অংশটি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সেটির ওপর। যখন আমাদের দেহ পর্যাপ্ত বিটা হিমোগ্লোবিন চেইন তৈরিতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখনই বিটা থ্যালাসেমিয়া নামক অবস্থার সৃষ্টি হয়।

এখন, বিটা হিমোগ্লোবিন চেইন তৈরিতে সচরাচর দুইটি জিন অংশ নেয়। সন্তান এই প্রতিটি জিন তার বাবা ও মা উভয়ের তরফ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হয়।

সন্তান যদি একটিমাত্র মিউটেটেড জিন উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে তার দেহে লক্ষণসমূহ তেমন তীব্রভাবে দেখা দেয়না। এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিটা থ্যালাসেমিয়া বা থ্যালাসেমিয়া মাইনর (thalassemia minor) ও বলা হয়ে থাকে।

অপরদিকে, সন্তান দুইটি মিউটেটেড জিনের অধিকারী হলে লক্ষণগুলো বেশ তীব্রভাবে দেখা দেয়। এই অবস্থাকে থ্যালাসেমিয়া মেজর (thalassemia major) বা কুলি অ্যানেমিয়া (Cooley anemia) বলা হয়।

কুলি অ্যানেমিয়ার ক্ষেত্রে লক্ষণসমূহ নিম্নরূপ:

১। মেজাজ খিটখিটে হওয়া

২। ত্বক ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করা

৩। ক্ষুধামন্দা

৪। দেহে ঘন ঘন সংক্রমণ অর্থাৎ ইনফেকশন

৫। জন্ডিস

৫। বর্ধিত অঙ্গ

ত্রুটিযুক্ত দুইটি মিউটেটেড বিটা হিমোগ্লোবিন জিন নিয়ে জন্মানো সন্তানেরা জন্মগতভাবে সচরাচর স্বাস্থ্যবানই হয়ে থাকে। তবে জন্মের প্রথম দুই বছরের মাথায়ই তাদের দেহে লক্ষণগুলো বেশ প্রকটরূপে ধরা দেয়।

এছাড়াও, দুইটি পরিবর্তিত জিনের কারণে থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়া (thalassemia intermedia) নামক একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়, যা তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ। এক্ষেত্রে রোগীকে ব্লাড ট্রা্ন্সফিউশন থেরাপির মধ্য দিয়ে নাও যেতে হতে পারে।

স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরিপ থেকে জানা গিয়েছে যে, বেটা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের গড় আয়ু ৩০ হয়ে থাকে।

থ্যালাসেমিয়া সংক্রান্ত জটিলতা

লক্ষণসমূহ তীব্র না হলে যেসকল জটিলতা দেখা দেয় সেগুলো নিম্নরূপ:

১। দেহে লৌহ বা আয়রনের অতিরিক্ততা

থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীরা ঘনঘন ব্লাড ট্রান্সফিউশন থেরাপির কারণে কিংবা রোগজনিত কারণে অতিরিক্ত আয়রনের অধিকারী হয়ে থাকে।

আয়রন দেহের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান হলেও অতিরিক্ত আয়রন ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে দেহের হৃৎপিণ্ড, যকৃৎ এবং এন্ডোক্রাইন সিস্টেম (endocrine system) বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলশ্রুতিতে দেহের হরমোন উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

২। ঘন ঘন ইনফেকশন

থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে যদি প্লীহা অপসারণ করা হয়, সেক্ষেত্রে দেহে সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে যায়।

পক্ষান্তরে, থ্যালাসেমিয়া প্রকটাকার ধারণ করলে নিম্নরূপ জটিলতা দেখা দেয়ঃ

১। অস্থিবিকৃতি

থ্যালাসেমিয়া রোগীদের অস্থিমজ্জা বেড়ে যাবার ফলে হাড়ের সমস্যা দেখা দেয়, যার মাঝে অস্থিবিকৃতি ছাড়াও অস্বাভাবিক হাড়ের বৃদ্ধি ও গঠনও অন্যতম। বিশেষ করে মুখের হাড় এবং মাথার খুলিতে এই সমস্যা দেখা দেয়।

অস্থিমজ্জার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হাড়ের ভঙুরতার অন্যতম কারণ, যার ফলে হাড়ের ফ্র্যাকচার এমনকি অস্টিওপোরোসিস দেখা দিতে পারে।

২। বর্ধিত প্লীহা

প্লীহা আমাদের দেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ, যা দেহের ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াই করার পাশাপাশি পুরাতন বা বিকৃত রক্তকণিকার মত দেহাভ্যন্তরের অবাঞ্ছিত পদার্থগুলো ফিল্টার করতে সাহায্য করে।

থ্যালাসেমিয়ার কারণে প্রচুর সংখ্যক লোহিত কণিকা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ফলশ্রুতিতে প্লীহা আকৃতিতে অড় হয়ে যায় এবং স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি কঠোর পরিশ্রম করে। অর্থাৎ এর কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়।

বর্ধিত প্লীহার কারণে রক্তস্বল্পতা আরো খারাপ রূপ ধারণ করে। এর ফলে লোহিত রক্তকণিকার পরিমাণ কমে যায়। প্লীহার আকৃতি অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে গেলে চিকিৎসকরা এটি অপসারণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

৩। বিলম্বিত বয়ঃসন্ধিকাল

৪। হৃদরোগজনিত সমস্যা

কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিওর (Congestive heart failure) ছাড়াও অনিয়মিত হৃদস্পন্দনও থ্যালাসেমিয়ার জটিলতার অন্তর্ভুক্ত।

শিশুদের ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া

পূর্বেই উল্লেখিত, জন্মের প্রথম দুই বছরের মাথায় শিশুর দেহে থ্যালাসেমিয়ার উপসর্গসমূহ প্রকট হয়, যেগুলোর মাঝে ঘন ঘন ইনফেকশন এবং হৃৎপিণ্ডের দুর্বলতা অন্যতম।

স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরিপে জানা গিয়েছে, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ লাখেরও বেশি শিশু থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হয়।

পিতা মাতা উভয়ই কিংবা যেকোন একজনও যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে প্রতি গর্ভাবস্থায় প্রায় ২৫ শতাংশ শিশু এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।

এছাড়াও এক্ষেত্রে প্রায় ৫০ শতাংশ শিশু বাহক হিসেবে জন্ম নেয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আশার কথা এই যে, পিতা ও মাতা উভয়েই বাহক হওয়া সত্ত্বেও শতকরা ২৫ শতাংশ শিশু সুস্থভাবে জন্ম নেয়।

শিশুদের ক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা করানো উচিৎ। যদি পিতা মাতা উভয়েই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের উচিত অতিসত্বরই টেস্ট করানো।

গর্ভাবস্থায় অনাগত সন্তানের থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা তা পরীক্ষার জন্য বেশ কয়েক রকমের টেস্টের পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা, যেগুলোর মধ্যে অ্যামনিওসেনটিসিস (Amniocentesis)ফিটাল ব্লাড স্যাম্পলিং (Fetal blood sampling) উল্লেখযোগ্য।

থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা

সময়মত চিকিৎসা না করানো হলে শিশুর যকৃৎ, হৃৎপিণ্ড এবং প্লীহা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে, এমনকি শিশু মৃত্যুমুখেও পতিত হতে পারে।

প্রথম ধাপ: রোগ নির্ণয়

উপসর্গসমূহের উপর ভিত্তি করে কেউ যদি সন্দেহ করে থাকেন যে তিনি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত, তাহলে প্রথমেই তার উচিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।

বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের পর চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হবার জন্য চিকিৎসক রোগীকে বেশকিছু টেস্ট দিয়ে থাকেন। এগুলোর মাঝে সিবিসি (CBC) বা কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (complete blood count) টেস্ট এবং হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস টেস্ট (hemoglobin electrophoresis test) অন্যতম।

দ্বিতীয় ধাপ: করণীয়

টেস্টের মাধ্যমে যদি থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ে, সেক্ষেত্রে ব্লাড এক্সপার্ট কিংবা হেমাটোলজিস্টদের সাথে পরামর্শ করা বাঞ্ছনীয়। এছাড়াও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ কিংবা লিভার স্পেশালিস্টদের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

তৃতীয় ধাপ: চিকিৎসাব্যবস্থা

যারা প্রচ্ছন্নভাবে থ্যালাসেমিয়ার অধিকারী, তাদের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে কোন ট্রিটমেন্টের দরকার হয়না। কিন্তু যাদের থ্যালাসেমিয়া তীব্রতর আকার ধারণ করে, তাদের দেহে অক্সিজেন হ্রাসজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফলশ্রুতিতে তাদেরকে বেশকিছু ট্রিটমেন্টের মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে। যেমন:

১। ব্লাড ট্রান্সফিউশন থেরাপি

এই চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগীকে ব্লাড ডোনেশান কিংবা হিমোগ্লোবিন দিতে হতে পারে। ট্রান্সফিউশনের মেয়াদ এবং সংখ্যা দুটোই নির্ভর করে রোগীর থ্যালাসেমিয়ার তীব্রতা এবং বয়সের উপর।

থ্যালাসেমিয়ায় ব্লাড ট্রান্সফিউশন থেরাপি

কেউ কেউ প্রতি সপ্তাহে একবার এই থেরাপি নিয়ে থাকেন। তবে বয়সবৃদ্ধির সাথে সাথে ট্রান্সফিউশনের মাত্রায় প্রভাব পড়ে।

ব্লাড ট্রান্সফিউশন থেরাপি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অনেক। এর ফলে রোগীর দেহে আয়রনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, জ্বর, ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব, শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এমনকি নিম্ন রক্তচাপও দেখা দিতে পারে, যা রোগীর জন্য হুমকিস্বরূপ। এজন্য চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় ঔষধ এবং সাপ্লিমেন্ট নেয়া জরুরী।

২। বোন ম্যারো ট্র্যান্সপ্ল্যান্টেশন (bone marrow transplant) বা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন

৩। প্লীহা অপসারণ

৪। জিন থেরাপি

চতুর্থ ধাপ: প্রতিষেধক এবং ঔষধ সেবন

যেহেতু থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ, এটি চিরতরে প্রতিকারের কোনরূপ চিকিৎসা নেই। তবে থ্যালাসেমিয়া জনিত জটিলতা এড়াতে বেশকিছু পন্থা অবলম্বন করা যায়।

সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে Centers for Disease Control and Prevention (CDC) বেশকিছু প্রতিষেধক নেয়ার সুপরামর্শ দিয়ে থাকে। সেগুলো নিম্নরূপ:

১। হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি (haemophilus influenza type b)

২। হেপাটাইটিস (hepatitis)

৩। মেনিনজোকক্কাল (meningococcal)

৪। নিউমোকক্কাল (pneumococcal)

এছাড়াও ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট নেয়া জরুরী।

পঞ্চম ধাপ: সুষম খাদ্যাভ্যাস

একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর ক্ষেত্রে সুষম খাদ্যাভ্যাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ফলে দেহে প্রয়োজনীয় শক্তি, পুষ্টি ছাড়াও হাড় বেশ মজবুত ও কর্মক্ষম হয়।

পুষ্টিবিদ ও ডায়েটেশিয়ানদের মতে, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্যে কম চর্বিযুক্ত নিরামিষ এবং উদ্ভিজ্জ খাবার বেশি উপকারী। নিয়মিত ব্লাড ট্রান্সফিউশনের কারণে যেহেতু রোগীদের দেহে আয়রনের মাত্রা বেশি, সেহেতু পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে লো আয়রন ডায়েট করা বাঞ্ছনীয়।

এই ডায়েট মেনে চললে উচ্চমাত্রার আয়রনসমৃদ্ধ মাছ বা মাংস গ্রহণে বিরত থাকা উচিত। এর পাশাপাশি আয়রন সমৃদ্ধ পিল বা ঔষধ সেবনে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী।

থ্যালাসেমিয়ার কারণে দেহে ফলিক এসিড (folic acid) এর অপর্যাপ্ততা দেখা দিতে পারে। ডায়েট চার্টের খাবারে পর্যাপ্ত ফলিক এসিড গ্রহণে ব্যর্থ হলে রোগীর উচিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দৈনিক এক মিলিগ্রাম ফলিক এসিড সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা।

থ্যালাসেমিয়া ডটকম থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর যেসকল খাবার গ্রহণে বিরত থাকা উচিত সেগুলো নিম্নরূপ:

১। প্রোটিন জাতীয় যেসব খাবার পরিহার করা উচিত:

  • ঝিনুক
  • যেকোন প্রাণীর কলিজা
  • শিমজাতীয় সবজি
  • গরুর মাংস
  • পিনাট বাটার
  • টফু

২। শস্যজাতীয় যেসব খাবার পরিহার করা উচিত:

  • টরটিলা ফ্লাওয়ার
  • শিশুদের ফর্টিফাইড সিরিয়াল (fortified cereal)
  • কর্ণফ্লেক্স, ১০০% ব্রানজাতীয় শস্য

৩। যেসব ফল/সবজি পরিহার করা উচিত:

  • তরমুজ
  • পালংশাক
  • যেকোন সবুজ পাতাযুক্ত সবজি বা শাক
  • খেজুর
  • কিশমিশ
  • ব্রোকলি
  • মটরশুঁটি
  • ফাভা বিনস (Fava beans)
ষষ্ঠ ধাপ: সতর্কতা এবং মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ

থ্যালাসেমিয়া রোগের ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি এবং সতর্কতা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, অসুস্থ রোগীদের থেকে দূরে থাকা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা ছাড়াও একজন জেনেটিক কাউন্সেলরের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

শুধু চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই নয়, বরং আদর্শ জীবনযাত্রার পন্থা গড়ে তোলার মাধ্যমেও থ্যালাসেমিয়ার প্রকোপ অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এর জন্য দরকার বেশকিছু মাঝারী তীব্রতার শারীরিক অনুশীলন। যেমনঃ

১। নিয়মিত হাঁটা

২। সাইকেলিং

৩। সাঁতার কাটা

৪। ইয়োগা বা যোগব্যায়াম ইত্যাদি।

শেষ কথা

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে থ্যালাসেমিয়ার মত অকাল ব্যাধির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য আমাদের দরকার সচেতনতার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সতর্কতা এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা।

পাশাপাশি থ্যালাসেমিয়া মোকাবেলায় আমাদের উচিত মানসিকভাবে শক্ত থাকা এবং অনাগত প্রজন্মকেও এসম্পর্কে অবগত করা।


Nadia Afroz

I am a graduate of department of English from East West University. Academic writing, free writing are my basic skills. Besides, cooking, watching cooking shows and reading books are my hobbies.

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।