গর্ভবতী হওয়া লক্ষণ সম্পর্কে জানতে চান? একজন বিবাহিত নারীর জন্য তার গর্ভকালীন সময়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেগনেন্ট হওয়ার প্রথম ৬ সপ্তাহের মাঝেই প্রায় ৬০ শতাংশ নারী গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ খুঁজে পান এবং প্রায় ৯০ শতাংশ নারী প্রথম ৮ সপ্তাহের মাঝে গর্ভধারণের প্রাথমিক লক্ষণ সমূহ দেখতে পারেন।

যদিও প্রেগন্যান্সি টেস্ট এবং আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে একজন নারী নিশ্চিত হতে পারেন যে তিনি গর্ভবতী কিনা, তবুও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আমাদের সাধারণ কিছু গর্ভধারণের লক্ষণ জেনে রাখা উচিত।

আপনি কি নতুন বিবাহ করেছেন, কিংবা বাচ্চা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বা গর্ভধারণ করেছেন বলে মনে হচ্ছেন! গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ গুলো সম্পর্কে আজকের আর্টিকেলটি তাহলে আপনার জন্যই।

সূচীপত্র

গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ : গর্ভধারণের প্রাথমিক লক্ষণ সমূহ

প্রত্যেক নারী আলাদা। তাদের গর্ভাবস্থার অভিজ্ঞতাও তাই। এমনকি একই মহিলার প্রাথমিক গর্ভাবস্থা থেকে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় একই লক্ষণ থাকে না। আবার প্রথমবার গর্ভবতী হলে যেসব লক্ষণ দেখা দেয়, দ্বিতীয়বারেও একইরকম উপসর্গ দেখা দিবে এমনটা নাও হতে পারে।

এছাড়াও, যেহেতু গর্ভবতী হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলি প্রায়ই ঋতুস্রাবের কিছুদিন আগের এবং ঋতুস্রাব চলাকালীন সময়ের অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায়। তাই আপনি প্রথমবার গর্ভবতী হলে যে লক্ষণগুলো অনুভব করবেন তা থেকে আপনি নাও বুঝতে পারেন যে আপনি গর্ভধারণ করেছেন।

তবে গর্ভাবস্থার প্রাথমিক লক্ষণগুলোর একাধিক উপসর্গ আপনার মাঝে দেখা দিলে প্রাথমিকভাবে ধরে নেওয়া যায় যে আপনি গর্ভধারণ করেছেন, এবং নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরবর্তী ধাপে টেস্ট করাতে পারেন।

তাহলে চলুন গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ কি কি, এবং এসময়ে কি কি সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী সেসব বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

১। ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিং (implantation bleeding)

গর্ভাবস্থার প্রথম সপ্তাহ থেকে চতুর্থ সপ্তাহের মধ্যে একজন নারীর দেহে সেলুলার (cellular) বা কোষসংক্রান্ত পর্যায়ের কার্যক্রম চলতে থাকে। এই সময়ের মাঝে নিষিক্ত ডিম্বানু একটি ব্লাস্টোসিস্ট (blastocyst) বা তরলে পরিপূর্ণ কোষগুচ্ছের সৃষ্টি করে, যা একসময় শিশুর দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিকাশ লাভ করে।

কনসেপশন (conception) বা গর্ভধারণের ১০-১৪ দিন পর এন্ড্রোমেট্রিয়াম (endometrium) বা নারীর জরায়ুগাত্রে এই ব্লাস্টোসিস্ট সংযুক্ত হয়। ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিং এর মূল কারণ এটিই। এই ব্লিডিং এর ফলে তলপেটে খিচ দিয়ে ব্যথা বা ক্র্যাম্পিং (cramping) দেখা দিতে পারে, যেগুলো একজন নারীর গর্ভধারণের অন্যতম বড় লক্ষণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য।

সচেতনতা বা উপযুক্ত জ্ঞানের অভাবে অনেকেই ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিংকে হালকা পর্যায়ের ঋতুস্রাব বলে ভুল ধারণা করে থাকেন। তাদের জন্য ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিং এর লক্ষণসমূহ তুলে ধরা হল:প্রথমবার গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ

  • রক্তের রং: প্রতিটি পর্বেই রক্তের রঙ হালকা গোলাপি, বাদামি বা লাল হতে পারে। স্বাভাবিক ঋতুস্রাবের মত কখনই গাঢ় পর্যায়ের রঙ হবেনা।
  • রক্তের ঘনত্ব: ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিংয়ে স্বাভাবিক ঋতুস্রাবের চেয়ে রক্তের ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে হালকা হয়ে থাকে। অল্প পরিমাণে গোলাপি বা বাদামি স্রাব দেখা দেয় বলে এই অবস্থাকে গাইনোকোলজির ভাষায় স্পটিং (spotting) বলা হয়।
  • স্থায়িত্বকাল: এটি কয়েক ঘন্টাও স্থায়ী হতে পারে, আবার তিন দিনের মাঝেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
  • ব্যথা: এই ব্লিডিংয়ের ফলে ব্যথা সাধারণত হালকা এবং মাঝারি হয়ে থাকে। সাধারণ ঋতুস্রাবের মত তীব্র পর্যায়ের দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা এই ব্লিডিংয়ে অনুপস্থিত। উল্লেখ্য, ৪৫৩৯ জন নারীর মাঝে গবেষণা চালিয়ে দেখা গিয়েছে যে, শতকরা ২৮ জন নারীই হালকা পর্যায়ের স্পটিং এবং ব্লিডিংয়ের সাথে ব্যথা অনুভব করে থাকেন।
  • ধারাবাহিকতা: সাধারণ ঋতুস্রাবের মত এর ধারাবাহিকতা অনিয়মিত পর্যায়ের, এই অবস্থাকে অন অ্যান্ড অফ স্পটিং (on-and-off spotting) বলা হয়।
  • সময়কাল: ডিম্বানু নিষিক্ত হবার ছয় থেকে বারো দিনের এই সময়টিকেই ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিংয়ের সম্ভাব্য সময়কাল বলে ধারণা করা হয়। তবে ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিং সাধারণত সাধারণ ঋতুস্রাবের নির্দিষ্ট ও সম্ভাব্য তারিখের আগেই ঘটে যায় দেখে সেটি চিহ্নিত করা সহজ।

মূলত ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিং এবং সাধারণ মাসিক বা ঋতুস্রাবের মাঝে পার্থক্যগুলো জানা থাকলে ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিং চিহ্নিত করা আরো সহজ হয়।

সতর্কতা

ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিংয়ের জন্য কোন নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। এটি গর্ভাবতী হওয়ার একটি সাধারণ লক্ষণ। তবুও যেকোন গর্ভবতী নারীরই উচিত অতিরিক্ত মাত্রার রক্তপাত এড়ানোর জন্য ধূমপান, মদ্যপান কিংবা অবৈধ ঔষধ ব্যবহারকে এড়িয়ে চলা।

২। সাদা স্রাব নির্গত হওয়া

গর্ভকালীন সময়ে একজন নারীর যোনিপথের প্রাচীরের কোষসমূহের বৃদ্ধি খুব সাধারণ একটি বিষয়। এর ফলে যোনিপথের প্রাচীর ঘন হতে থাকে। ফলশ্রুতিতে একজন গর্ভবতী নারীর যোনিপথ থেকে সাদা এবং ঘন আঠালো স্রাব নির্গত হয়। এর বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপঃ

  • সময়কাল: সাধারণত গর্ভধারণের পরপরই স্রাব নির্গমন শুরু হয়।
  • স্থায়িত্বকাল: একজন নারীর প্রেগন্যান্সির পুরো সময়টি জুড়েই এই স্রাব নির্গত হতে থাকে।

সতর্কতা: এই স্রাবজনিত অবস্থাটি সাধারণত ক্ষতিকর নয়। তবে নিম্নলিখিত অবস্থাসমূহ দেখা দিলে যেকোন গর্ভবতী নারীরই উচিত চিকিৎসকের শরনাপন্ন হওয়া:

  • যদি স্রাব নির্গমনের পাশাপাশি জ্বালা কিংবা চুলকানি অনুভব করে থাকেন
  • স্রাবে যদি দুর্গন্ধ থাকে

উপরোক্ত দুটো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অবশ্যই ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন (bacterial infection) টেস্ট করানো উচিত।

৩। পিরিয়ড বা মাসিক মিস হওয়া

সাধারণত গর্ভধারণের চার সপ্তাহ পর পরবর্তী ঋতুস্রাবের সময়টি মিস হয়। আর এটিই একজন নারীর গর্ভধারণের প্রধান লক্ষণ হিসেবে বিবেচ্য। তবে কেউ যদি অনিয়মিত ঋতুস্রাবের শিকার হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে তার উচিত হোম প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিটের সাহায্যে hCG ইউরিন টেস্ট করে এটি আসলেই গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ কিনা সেসম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া।

hCG ইউরিন টেস্ট কি?

একজন নারী গর্ভবতী কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হচ্ছে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করানো। আর প্রেগন্যান্সি টেস্টের সাথে যে নামটি জড়িত সেটি হচ্ছে hCG বা human chorionic gonadotropin হরমোন। তাই প্রাথমিক সতর্কতা ও প্রস্তুতি গ্রহণের আগে আমাদের উচিত hCG এবং এই টেস্টের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়গুলো জেনে নেয়া।

hCG কি?

ইমপ্ল্যান্টেশন (implantation) প্রক্রিয়া শেষ হবার পর একজন গর্ভবতী নারীর দেহে নিষিক্ত ডিমটি ভ্রুণে পরিণত হতে থাকে। তখন এই ডিমটিকে ঘিরে থাকা কোষগুলো একত্রে প্লাসেন্টা (placenta) বা অমরা তৈরি করে। এই প্লাসেন্টা যে হরমোন তৈরি করে তাকেই human chorionic gonadotropin বা hCG ও বলা হয়। এই হরমোনের মূল কাজ হলো ডিম্বাশয় থেকে প্রতি মাসে পরিপক্ক ডিম ছাড়তে বাধা প্রদান করা এবং সুস্থ গর্ভাবস্থা বজায় রাখা।

hCG ইউরিন টেস্টের উদ্দেশ্য

এই টেস্টের সাহায্যে একজন নারী তার ইউরিনে প্রেগন্যান্সি হরমোনের উপস্থিতি পরীক্ষা করতে পারেন। একজন নারী যদি গর্ভবতী হন, তাহলে এই পরীক্ষাটির সাহায্যে খুব সহজেই তার ইউরিনে hCG হরমোনের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারবেন।

বলে রাখা ভালো, এই টেস্টের মাধ্যমে শুধুমাত্র হরমোনটির উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়, ইউরিনে হরমোনটির মাত্রা বা পরিমাণ কতখানি তা এই টেস্টের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না।

গর্ভাবস্থার ৮ থেকে ১০ সপ্তাহের মধ্যবর্তী সময়ে একজন গর্ভবতী নারীর ইউরিনে hCG স্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। সাধারণত গর্ভাবস্থার ১০ম সপ্তাহের মাথায় hCG স্তর শীর্ষে পৌছে যায়, এবং প্রসবের আগ পর্যন্ত তা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।

hCG ইউরিন টেস্ট কীভাবে করবেন?

একজন গাইনি বিশেষজ্ঞের কাছে কিংবা বাসায়, উভয় জায়গাতেই একজন নারী তার hCG ইউরিন টেস্ট করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তার প্রয়োজন হবে একটি প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট। এই কিটের মাঝেই প্রয়োজনীয় নির্দেশনাবিধি দেয়া থাকে। সেগুলো নিম্নরূপ:

  • প্রথম মাসিক ঋতুস্রাব মিস হওয়ার পর অন্তত ১ থেকে ২ সপ্তাহ অপেক্ষা করা। বিশেষজ্ঞরা সাধারণত এই সময়টিতে নারীদেরকে ধৈর্যধারণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন, কেননা অনেক সময় অনিয়মিত ঋতুস্রাব বা ঋতুস্রাব শেষ হওয়ার ভুল সময়সীমার কারণে টেস্টে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
  • ঘুম থেকে উঠার পরপরই ইউরিন স্যাম্পল নিয়ে টেস্টটি করা উচিত। কারণ সেসময় ইউরিনের ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে, যে জন্য hCG শনাক্ত করা সহজ হয়।
  • কিছু হোম প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিটের ক্ষেত্রে ইনডিকেটর স্টিকটিকে অন্ততপক্ষে ৫ সেকেন্ড ইউরিনের প্রবাহে ধরে রাখতে হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে ইউরিন স্যাম্পল সংগ্রহ করে সেটিতে ইনডিকেটর স্টিকটিকে ডুবিয়ে রাখতে হয়। এই ইনডিকেটরের কাজ হলো টেস্ট সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা।
  • বেশিরভাগ টেস্টের ক্ষেত্রেই ফলাফল পেতে অন্তত ৫-১০ মিনিট সময় লাগে। যদি টেস্ট কিট স্টিকে একটি রঙিন রেখা আসে, সেক্ষেত্রে ফলাফল নেগেটিভ ধরা হয়। অপরদিকে, দুটো রেখা দেখা দিলে একজন নারী নিশ্চিত হতে পারেন যে তিনি গর্ভধারণ করেছেন।গর্ভধারণের লক্ষণ

সতর্কতা

  • টেস্ট কিট ব্যবহারের আগে অবশ্যই নির্দেশনা সতর্কতার সাথে পড়ে নেওয়া উচিত।
  • কিটের মেয়াদ ঠিক আছে কিনা তা দেখে নেয়া জরুরি। অনেকসময় মেয়াদোত্তীর্ণ কিটের ক্ষেত্রে নেতিবাচক ফলাফল আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
  • টেস্ট কিটের কন্ট্রোল ইনডিকেটর যদি সক্রিয় না হয় বা কাজ না করে, সেক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে যে টেস্টটি সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি।
  • hCG ইউরিন টেস্টের ক্ষেত্রে false-positive কিংবা false-negative—উভয় ফলাফলই জড়িত। যদি ফলাফল false-positive আসে, সেক্ষেত্রে গর্ভবতী না হওয়া সত্ত্বেও প্রেগন্যান্সি কিটে ফলাফল পজেটিভ আসতে পারে।
  • ফলাফল পজেটিভ আসার অর্থ হচ্ছে একজন নারীর ইউরিনে পর্যাপ্ত পরিমাণে hCG হরমোনের উপস্থিতি শনাক্ত করা গিয়েছে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসক তার প্রেগন্যান্সি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য কিছু আনুষঙ্গিক টেস্ট দিয়ে থাকেন।
  • অনেক ক্ষেত্রে টেস্টের ফলাফল false-negative হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। সেক্ষেত্রে দেখানো হয় যে নারী গর্ভবতী নন বা গর্ভধারণে প্রস্তুত নন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি গর্ভধারণ করেছেন। এরকম তখনই হয়ে থাকে যখন কোন নারী তার অনাগত সন্তান গ্রহণের জন্য কোন পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, অথবা ঋতুস্রাব মিস হওয়ার এক সপ্তাহ পূরণের আগেই যদি তিনি টেস্টটি করে থাকেন।
  • false-negative ফলাফল আসার পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো ঘুম থেকে উঠার পরপর ইউরিন স্যাম্পল না নিয়ে অন্যসময় স্যাম্পল নেয়া, ইউরিনে পর্যাপ্ত পরিমাণে hCG হরমোন ধারণের সুযোগ না দেয়া।
  • false-negative ফলাফল আসার পর পরবর্তী এক সপ্তাহের মাঝে পুনরায় টেস্ট করানো উচিত। এরপরেও যদি ফলাফল নেগেটিভ আসে, সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের শরনাপন্ন হওয়া জরুরি। এ পর্যায়ে চিকিৎসক হয়ত hCG ব্লাড টেস্ট করতে দিতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে ফলাফল পাওয়া বেশ সময়সাপেক্ষ।
  • খুব কম ক্ষেত্রে এই টেস্টে অস্বাভাবিক নন প্রেগন্যান্সি টিস্যুর উপস্থিতি দেখা যায়। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ বাঞ্ছনীয়।
  • উল্লেখ্য, এসব লক্ষণ নারীর গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে দেখা দেয়, বিশেষ করে যখন ইউরিনের ঘনত্ব হালকা হয়ে থাকে। এজন্য চিকিৎসকরা পানি বা অন্যান্য তরল পদার্থ সেসময় কম পান করতে বলেন, যাতে ইউরিনের ঘনত্ব পাতলা না হয়ে যায়। কেননা এতে hCG শনাক্ত করা কঠিন হয়।
  • কোন নারী যদি ইতোমধ্যে বিশেষ কোন ঔষধ সেবনে অভ্যস্ত হন, সেক্ষেত্রে hCG টেস্টের আগে অবশ্যই তার উচিত চিকিৎসককে এই ব্যাপারে নিশ্চিত করা।

জন্মের আগে ও পরে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের পেছনে একটি গুরুত্বপুর্ণ পর্যায় হিসেবে এই hCG ইউরিন টেস্ট অন্যতম ভূমিকা পালন করে। তাই সকল নারীরই উচিত প্রয়োজনীয় সতর্কতাবিধি অবলম্বনের মাধ্যমে এই টেস্ট সম্পন্ন করা।

৪। ব্রেস্টের আনুষঙ্গিক পরিবর্তন

সাধারণত গর্ভাবস্থার ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ সপ্তাহের মধ্যে একজন নারী তার ব্রেস্টের সাথে সম্পর্কিত যাবতীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করেন, যেগুলোর মাঝে ফোলা ফোলা ভাব বা ব্যথা করে উঠা উল্লেখযোগ্য। হরমোনের অসামঞ্জস্যতাই মূলত এ সকল পরিবর্তনের পেছনে প্রধান কারণ। পরবর্তীতে গর্ভবতী নারীর দেহ হরমোনের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারলে কয়েক সপ্তাহের মাঝে এই শারীরিক জটিলতাগুলো দূর হয়ে যায়।

গর্ভাবস্থার ১১ সপ্তাহের মাথায় ব্রেস্টের বৃদ্ধিসাধন ঘটে, যা খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। কখনো ব্রেস্টের অ্যারিওলা (areola) গাঢ় বর্ণ ধারণ করে এবং আকারে বৃদ্ধি পায়।

সতর্কতা

  • ব্রেস্টের এই আকস্মিক পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য ঢিলেঢালা ও আরামদায়ক ম্যাটারনিটি ব্রা বা অন্তর্বাসের কোন বিকল্প নেই। চিকিৎসক বা অভিজ্ঞজনের পরামর্শ নিয়ে অন্তর্বাসের ম্যাটারিয়াল দেখে তা বাছাই করা বাঞ্ছনীয়।
  • ব্রেস্ট স্কিনের সুরক্ষার জন্য মানানসই ব্রেস্ট প্যাড কিনে নেয়া উচিত।

৫। ইউরিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া

গর্ভাবস্থায় একজন নারীর দেহে রক্তের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে আমাদের কিডনি বেশি মাত্রায় তরল উৎপন্ন করে এবং মুত্রাশয়ে ইউরিনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। সুতরাং ঘন ঘন প্রস্রাবের মাত্রা বেড়ে যাওয়া গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ।

মুত্রাশয়ের সুস্থ ও সচল কার্যপ্রক্রিয়ার পেছনে হরমোনের ভূমিকাও কম নয়। এজন্য সতর্কতার পাশাপাশি প্রতিদিন অতিরিক্ত ৩০০ মিলি পানি পান করা উচিত।

৬। মর্নিং সিকনেস (morning sickness) এবং বমি বমি ভাব

সাধারণত গর্ভাবস্থার ৪-৬ সপ্তাহের মাঝে একজন নারী মর্নিং সিকনেসের সম্মুখীন হন। তবে নামে মর্নিং সিকনেস হলেও এই অবস্থাটি দিনের যেকোন সময়েই হতে পারে। তখন বমি বমি ভাব কিংবা বমি হওয়া খুবই সাধারণ একটি বিষয়। যদিও এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ পাওয়া না গেলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গর্ভকালীন হরমোনের অসামঞ্জস্যতাই এর পেছনে ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের সংবেদনশীলতা এবং খাবারদাবারে অরুচিও এই বমি বমি ভাবের পেছনে অন্যতম কারণ।

গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিকে বেশ কয়েকবারই হালকা থেকে গুরুতর পর্যায়ের মর্নিং সিকনেসের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম ত্রৈমাসিকের শেষ পর্যায়ে এসে সিকনেস বেশ প্রবল আকার ধারণ করলেও দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের প্রারম্ভিক পর্যায়ে তা কমে আসে। তাই এ অবস্থায় বেশি করে পানি, গ্লুকোজ ও স্যালাইন পান করা জরুরি।

৭। কোষ্ঠকাঠিন্য এবং পেট ফুলে যাওয়া

গর্ভাবস্থার প্রারম্ভিক পর্যায়ে সাধারণত হরমোনের পরিবর্তনের কারণে পরিপাকতন্ত্র স্বাভাবিকের তুলনায় কম সক্রিয় হয়ে যায়। এর ফলে গ্যাসজনিত কারণে অ্যাবডোমিনাল ব্লটিং (abdominal bloating) বা পেট ফুলে যাওয়া এবং কনস্টিপেশন (constipation) বা কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। তাই মর্নিং সিকনেসের মতই এ অবস্থায় বেশি করে পানি পান করা উচিত।

৮। ওজন বেড়ে যাওয়া এবং স্থুলকায়তা

গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিকের শেষ পর্যায়ে এসে ওজন বেড়ে যাওয়া সাধারণ বিষয়। প্রথম কয়েক মাসের মাঝেই ওজন ৫-৬ কেজি বেড়ে যায়। একজন নারীর প্রারম্ভিক পর্যায়ের গর্ভাবস্থায় তার দেহের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালোরির পরিমাণ তার স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের থেকে খুব একটা বেশি হয়না।

৯। অকারণ ক্লান্তি ও অবসাদ

ফ্যাটিগ (Fatigue) টার্মটির সাথে আমরা কমবেশি সকলেই পরিচিত। প্রারম্ভিক গর্ভাবস্থার খুব স্বাভাবিক লক্ষণ এটি। দেহে প্রোজেস্টেরনের (progesterone) মাত্রা বেড়ে গেলে ঘুম ঘুম ভাব, ক্লান্তি বা অবসাদ দেখা দেয়।

সতর্কতা

  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা
  • গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে শরীরের তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই শয়নকক্ষের পরিবেশ আরামদায়ক ও তুলনামূলক শীতল রাখা।

১০। হৃদস্পন্দনের হার বৃদ্ধি পাওয়া

গর্ভাবস্থার ৮-১০ সপ্তাহের মাথায় একজন নারীর হৃৎপিণ্ড খুব দ্রুত এবং সক্রিয়ভাবে পাম্প করা শুরু করে। এর ফলে প্যালপিটেশন (Palpitations) এবং অ্যাররিথমিয়ার (arrhythmia) মত শারীরিক জটিলতা অনুভব করেন নারীরা। উল্লেখ্য, এর পেছনেও রয়েছে হরমোনের পরিবর্তনসূচক কারণ।

গর্ভাবস্থার প্রায় শেষের দিকে ভ্রুণের কারণে দেহাভ্যন্তরে রক্ত প্রবাহের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। তাই গর্ভবতী নারীর হৃদযন্ত্র সংক্রান্ত কোন সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ঔষধের ডোজ কমিয়ে আনাই শ্রেয়।

১১। উচ্চ রক্তচাপ এবং মাথা ঘোরানো

গর্ভাবস্থার সূচনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রক্তনালীর প্রসারণের কারণে রক্তচাপের তারতম্য দেখা দেয়। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপের সৃষ্টি হয়। তবে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপকে এর মূখ্য লক্ষণ হিসেবে নির্ধারণ করা বেশ জটিলই। কিন্তু উচ্চ রক্তচাপের কারণে এ সময়ে মাথা ঘোরানো বেশ সাধারণ একটি লক্ষণ। প্রথম ২০ সপ্তাহের মাঝে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিলে এর সাথে দেহের অভ্যন্তরীণ অন্যান্য সমস্যার সংযোগ আছে বলে ধারণা করা হয়।

সতর্কতা

  • চিকিৎসকের সাথে প্রথম অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় রক্তচাপ পরিমাপ করা জরুরি, যাতে তিনি একজন গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে তার স্বাভাবিক রক্তচাপের একটি বেজলাইন তৈরি করতে পারেন।
  • গর্ভকালীন সময়ের জন্য উপযুক্ত শারীরিক অনুশীলন এবং মেডিটেশনের মাধ্যমে হৃদযন্ত্র সচল ও প্রফুল্ল থাকে।
  • রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত সুষম খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হওয়া
  • নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করা এবং সচেতন হওয়া
  • পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা
  • চেয়ার থেকে উঠার সময় কোন কিছু ধরে আস্তে আস্তে সাবধানতার সাথে উঠা।

১২। বুক জ্বালাপোড়া করা

হরমোনের অসামঞ্জস্যতার কারণে পাকস্থলী প্রাচীরের এসিডগুলো প্রাচীরে ফুটো করে দেয়। এ জন্য বুক জ্বালাপোড়া করার মত অস্বস্তিকর উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

সতর্কতা

  • দিনে লম্বা সময় ধরে ভারী খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে খাবার খাওয়া
  • কমপক্ষে এক ঘন্টা সোজা হয়ে বসে থাকা, যাতে খাবার হজম হওয়ার সুযোগ পায়
  • এন্টাসিড জাতীয় ঔষধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া

গর্ভাবস্থার ১ম ত্রৈমাসিকের লক্ষণসমূহ

সব গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো সমানভাবে দেখা যায়না। তবুও বেশিরভাগ নারী গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ গুলো হলো:
গর্ভবতী হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ

  • মাসিক ঋতুস্রাব মিস হওয়া
  • বমি বমি ভাব
  • মাথা ঘোরানো
  • মাথাব্যথা
  • শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া
  • ঘন ঘন প্রস্রাব পাওয়া
  • ক্লান্তি ও অবসাদ
  • তলপেটে হালকা ব্যথা
  • মুড সুইং বা মেজাজের আকস্মিক পরিবর্তন
  • খাবারে অরুচি বা মুখের স্বাদ নষ্ট হওয়া, তবে বিশেষ কিছু খাবারের জন্য ক্র্যাভিং হতে পারে।

গর্ভাবস্থার ২য় ত্রৈমাসিকের লক্ষণসমূহ

এ সময়ে প্রথম ত্রৈমাসিকের লক্ষণগুলো প্রচ্ছন্ন হয়ে নতুন লক্ষণ দেখা দেয়। যেমনঃ

  • মাংসপেশী ও লিগামেন্টে ব্যথা, বিশেষ করে পায়ে ও কোমরে টান পড়া
  • শক্তি বৃদ্ধি
  • চুল, ত্বক ও নখে পরিবর্তন; বিশেষ করে ত্বকে সতেজতা এবং চুল ঝলমলে হওয়া
  • ক্ষুধা বৃদ্ধি
  • ব্যাকপেইন
  • স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া এবং মানসিক জটিলতায় ভোগা
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • মাথা ঘোরানো ও অজ্ঞান হওয়া
  • গর্ভবতী নারীর পরিপাকতন্ত্রে গর্ভের বাচ্চার চাপ প্রয়োগের ফলে হেমোরোয়েড (Hemorrhoid) এর সৃষ্টি হয়।

গর্ভাবস্থার ৩য় ত্রৈমাসিকের লক্ষণসমূহ

  • হরমোনের তারতম্য বেড়ে যাবার ফলে তীব্র ব্যথা অনুভূত হওয়া
  • ঘুমে ব্যাঘাত
  • নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা
  • ব্রেস্টে দুগ্ধগ্রন্থির সক্রিয়তার ফলে কোলোস্ট্রাম (colostrum) নামক হালকা হলুদাভ পদার্থ তৈরি হওয়া
  • মাথাব্যথা
  • মেটাবলিজম হার বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত গরম অনুভূত হওয়া
  • প্লাসেন্টাজনিত জটিলতার কারণে হালকা রক্তপাত
  • স্ট্রেচ মার্কস বা পেশীতে দাগ পড়া
  • পেটে চাপ পড়া

গর্ভবতী নারীদের জন্য করণীয়

  • প্রিন্যাটাল ভিটামিন (prenatal vitamin) নেয়া
  • পর্যাপ্ত খাদ্যাভ্যাস, বিশ্রাম ও হালকা শারীরিক অনুশীলন করা
  • চা-কফি সহ অন্যান্য ক্যাফেইন সমৃদ্ধ পানীয় গ্রহণে বিরত থাকা
  • ভারী কাজ না করা
  • আরামদায়ক ও ঢিলেঢালা পোষাক, জুতা ব্যবহার করা
  • ওজন বৃদ্ধি, ঔষধ সেবনসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ের সমন্বয়ে নির্দিষ্ট বার্থ প্ল্যান লিখে রাখা।

গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ বিষয়ে শেষ কথা

আপনার জেনে রাখা উচিত যে, গর্ভবতী হওয়ার এই লক্ষণগুলো গর্ভধারণ ছাড়া অন্যান্য কারণেও হতে পারে। সুতরাং আপনি এই লক্ষণগুলির মধ্যে কিছু লক্ষ্য করেন তার অর্থ এই নয় যে আপনি গর্ভবতী। নিশ্চিতভাবে বলার একমাত্র উপায় হল গর্ভাবস্থা পরীক্ষা।

একজন গর্ভবতী নারীর জীবনে তার গর্ভকালীন সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে অনাগত শিশুর সুস্থতা এবং দৈহিক ও মানসিক বিকাশের পুরোটাই নির্ভর করে মায়ের সুস্থতা এবং সচেতনতার ওপর। তাই প্রতিটি  মায়েরই উচিত গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ সম্পর্কে খুঁটিনাটি জেনে নিয়ে গর্ভাবস্থার আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।


Nadia Afroz

I am a graduate of department of English from East West University. Academic writing, free writing are my basic skills. Besides, cooking, watching cooking shows and reading books are my hobbies.

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!