ক্রায়োসার্জারি কি : মানবদেহ অসংখ্য কোষের সমন্বয়ে গঠিত। কোনো কোষ রোগাক্রান্ত হলে আমাদের দেহে এর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অসচেতন মানুষেরা এসব বিষয় নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামাননা। কিন্তু স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ মাত্রই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান৷ কোনো সমস্যা হলে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা নেন।

প্রাথমিক অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্থ দেহকোষ চিহ্নিত করতে পারলে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে তা সহজেই ট্রিটমেন্ট করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন পড়ে উন্নত চিকিৎসার।

ক্ষতিগ্রস্ত কোষ বা টিস্যুর চিকিৎসার জন্য তেমনি একটি আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির নাম হচ্ছে ক্রায়োসার্জারি। এটি বিজ্ঞানের একটি বিষ্ময়কর অবদান।

চলুন ক্রায়োসার্জারি কি এবং কিভাবে কাজ করে, এর সুবিধা ও অসুবিধা, প্রভৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

ক্রায়োসার্জারি কি?

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে ক্রায়োসার্জারি একটি অন্যতম শাখা। দিনের পর দিন এই পদ্ধতি মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

ক্রায়োসার্জারি শব্দটি একটি গ্রিক শব্দ। ‘ক্রায়ো’ অর্থ বরফের মতো ঠান্ডা আর ‘সার্জারি’ অর্থ হাতের কাজ। অর্থাৎ বরফের মতো হিমশীতল পদার্থ প্রয়োগ করে যে চিকিৎসা করা হয় তাই ক্রায়োসার্জারি।

এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে দেহের অনিয়ন্ত্রিত বা অস্বাভাবিক কোষকে ধ্বংস করতে আর্গন বা নাইট্রোজেন গ্যাসকে অত্যন্ত শীতল করে (বরফের মতো) আক্রান্ত স্থানে প্রয়োগ করা হয়।

ক্রায়োসার্জারি (ইংরেজি: Cryosurgery) বা ক্রায়োথেরাপি (ইংরেজি: Cryotherapy) হল অস্ত্রোপচারের অন্যতম একটি আধুনিক পদ্ধতি। অস্বাভাবিক টিস্যু ধ্বংস করতে নাইট্রোজেন গ্যাস বা আর্গন গ্যাস হতে উৎপাদিত প্রচন্ড ঠান্ডা তরল ত্বকের বাহ্যিক চামড়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় যা ক্রায়োসার্জারি নামে পরিচিত। (তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া)

এই পদ্ধতিতে নিম্ন তাপমাত্রা প্রয়োগ করা হয়। প্রয়োগকৃত স্থানের দেহকোষ জমাট বেধে ধ্বংস করা হয়।

ক্রয়োসার্জারিতে কোন কোন গ্যাস ব্যবহৃত হয়?

ক্রায়োসার্জারি চিকিৎসা পদ্ধতিতে নাইট্রোজেন, আর্গন, হিলিয়াম, ডাই মিথাইল ইথাইল প্রোপেন গ্যাস ব্যবহৃত হয়।

ক্রায়োসার্জারি চিকিৎসা পদ্ধতি ও ব্যবহার

ক্রায়োসার্জারি চিকিৎসা পদ্ধতি

ক্রায়োসার্জারি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। দেহে দুই ধরনের টিউমারের (বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণ) চিকিৎসার জন্য দুইটি পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।

বহিরাগত ক্যান্সার কোষ ধ্বংস বা নির্মূল করতে বেশ কিছু উপায়ে যেমন তুলা, সূচ বা স্প্রে মেশিন ব্যবহার করা হয়৷ এই উপায়ে তরল নাইট্রোজেন সরাসরি প্রয়োগ করা হয়।

আবার অভ্যন্তরীণ ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে ক্রায়োপ্রোব নামক একটি ফাপা ছোট্ট উপকরণ ব্যাবহার করা হয় যা ক্রায়োগানের সাথে সংযুক্ত থাকে।

  • ক্রায়োপ্রোব হচ্ছে একটি সরু নল যার মাধ্যমে বরফের মতো ঠান্ডাকৃত নাইট্রোজেন বা আর্গন গ্যাস প্রয়োগ করা হয়।
  • ক্রায়োপ্রোব এমন একটি উপকরণ বা যন্ত্র, যেটি দিয়ে জমাটবদ্ধ কোষ নিয়ন্ত্রণ করা এবং আক্রান্ত কোষ ছাড়া সুস্থ কোষগুলোর যেন ক্ষতি না হয় সেই বিষয়টি খেয়াল রাখে৷

আক্রান্ত কোষ সনাক্ত করার জন্য ডাক্তারগণ অতিসতর্কতা স্বরুপ (MRI) এমআরআই বা আল্ট্রাসাউন্ড ব্যাবহার করে থাকেন। এ পদ্ধতি ব্যাবহার করে শনাক্ত করার পর আক্রান্ত টিস্যুর তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ১২০-১৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নিয়া আসা হয় এবং তরল আর্গন গ্যাস প্রয়োগ করা হয়।

ফলে কোষটির পানি জমাটবদ্ধ হয় এবং বরফে পরিণত হয়। এতে করে কোষটিতে অক্সিজেন ও রক্ত চলাচল করতে পারেনা।

পরবর্তীতে হিলিয়াম গ্যাস ব্যাবহার করে কোষটির তাপমাত্রা পুনরায় বৃদ্ধি করা হয় এবং কোষটি ধ্বংস হয়ে যায়। ক্রায়োসার্জারির মূল বিশেষত্ব হচ্ছে সার্জারির পর টিউমার কোষটি শোষিত হয়ে যায়।

ক্রায়োসার্জারি পদ্ধতির দ্বারা দেহের বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ রোগ নিরাময়ে ব্যাবহার করা হয়, যেমন:

  • পাইলস ক্যান্সার
  • মুখের ক্যান্সার
  • যকৃত ও প্রস্টেট ক্যান্সার
  • ফুসফুস ক্যান্সার
  • স্তন ক্যান্সার ইত্যাদি।

এছাড়াও বাহ্যিক ছোট-বড় কিছু রোগ, যেমন মেছতা, ত্বকে ওঠা টিউমার ও ক্যান্সার ইত্যাদি রোগ নির্মূল করতেও ক্রায়োসার্জারি পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেওয়া হয়। 

ক্রায়োসার্জারিতে কেনো এমআরআই (MRI) ব্যাবহার করা হয়?

চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘Magnetic Resonance Imaging’ বা সংক্ষেপে MRI নামে পরিচিত। এটি চিকিৎসা ক্ষেত্রে একটি অন্যতম আধুনিক যন্ত্র।

দেহের অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোষ বা অঙ্গের অবস্থা খালি চোখে পর্যবেক্ষণ করা বা দেখা সম্ভব নয়৷ কিন্তু এমআরআই-এর মাধ্যমে দেহাভ্যন্তরস্থ কোনো অস্বাভাবিক কোষ বা রোগ শনাক্ত করা সম্ভব।

কারণ MRI দেহের অভ্যন্তরস্থ রোগাক্রান্ত কোষের স্পষ্ট ছবি তুলে নেয় এবং আক্রান্ত স্থান শনাক্ত করে। ভাবছেন কিভাবে সম্ভব?

MRI পদ্ধতি

MRI পদ্ধতিতে শক্তিশালী রেডিও ফ্রিকোয়েন্সী ব্যাবহার করা হয় যার মাধ্যমে ছবি তোলা এবং উক্ত স্থানটি সহজেই শনাক্ত করা যায়।

আমাদের শরীরে ৬০-৭০% পানি থাকে। পানির চৌম্বক ধর্ম থাকায় ম্যাগনেটের কাছাকাছি আসলে সকল সুস্থ্য কোষ একইসাথে একইবেগে ঘুরতে থাকে। কিন্তু যেসব কোষ নষ্ট কিংবা এনার্জি শূন্যতায় ভুগছে সেগুলো ঘুরতে পারেনা।

এরপর রেডিও ওয়েভ পাঠানো হয়, যা অসুস্থ্য কোষকে এনার্জি সরবরাহ করে এবং এরপর ঘুরতে শুরু করে।

আর এসব কোষের গতিবিধি কম্পিউটারে লক্ষ্য করে নষ্ট সেল বা কোষ চিহ্নিত করা হয়।

তবে এমআরআই স্ক্যান করতে ক্ষতিকর রশ্মি বিকিরণ হয়না যা দেহের জন্য ক্ষতিকর। মূলত এই কারণেই ক্রায়োসার্জারি চিকিৎসায় MRI ব্যাবহার করা হয়।

ক্রায়োসার্জারির সুবিধাসমূহ

  • ক্রায়োসার্জারি এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে ব্যাবহৃত অতি ঠান্ডা তরল পদার্থ আক্রান্ত স্থানে প্রয়োগ করলে উক্ত স্থানে রক্ত সরে যায় এবং রক্তনালি সংকুচিত হয়৷ যার ফলে রক্তপাত একেবারে হয়না বলা যায়। 
  • অস্ত্রোপচার বলুন অথবা রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপি, যেগুলো করলে শরীরে যে পরিমান ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, ক্রায়োসার্জারি করলে তেমন কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা যায়না। 
  • এই পদ্ধতিতে শীতক যন্ত্রটি এমনভাবে ব্যাবহার করা হয় যাতে দেহের টিস্যুগুলো সাময়িকভাবে কাজ করা বন্ধ করে এবং চিকিৎসা শেষ হলে টিস্যুগুলো পুনরায় কাজ করা শুরু করে দেয়। এভাবে আক্রান্ত টিস্যুগুলোকে প্রায় ৯০% পর্যন্ত ধ্বংস করা সম্ভব হয়।
  • অতি নিম্ন তাপমাত্রা দেহ কোষের অভ্যন্তরে প্রয়োগ করার ফলে কোষের ক্রিস্টালগুলো ছিন্ন হয়ে যায় বিধায় রক্তপাত ঘটে না। শল্য চিকিৎসা বা অন্যান্য অপারেশনে যেমন রক্তপাত হয় কিন্তু এ পদ্ধতিতে রক্তপাতহীন অপারেশন সম্ভব।

ক্রায়োসার্জারির অসুবিধাসমূহ

  • ক্রায়োসার্জারির কিছু ক্ষণস্থায়ী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে৷ এছাড়া এই পদ্ধতিতে আক্রান্ত স্থানের চিকিৎসা করার পরও স্থায়ীভাবে ভালো হবার নিশ্চয়তা কম।
  • অনেক ক্ষেত্রে কোনো ব্যাক্তি পুরুষত্ব হারাতে পারেন, মলদ্বারের ক্ষতি হতে পারে। 
  • রক্তনালিতে বা যকৃতে রক্তক্ষরণ হতে পারে।
  • ত্বকের চিকিৎসায় ক্রায়োসার্জারি পদ্ধতি অবলম্বন করলে ত্বক ফুলে যেতে পারে।
  • স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি এবং সংবেদনশীলতা হ্রাস পেতে পারে। 

পরিশেষ

ক্রায়োসার্জারি চিকিৎসা পদ্ধতিতে এনেছে ব্যাপক সফলতা৷ এই আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির ব্যাবহার রোগীর হয়রানি ও গ্লানি কমিয়ে দিয়েছে অনেকখানি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই অভিনব কৌশল চিকিৎসা পদ্ধতির সত্যিই এক বড় মাইলফলক।

তবে, এসব সুবিধা নিতে হলে আমাদের সচেতনতা জরুরী এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার বিকল্প নেই। সেই সাথে রোগ হলে ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে ধরে বসে থাকার বদ অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।

আশা করি, আজকের আলোচনা থেকে ক্রায়োসার্জারি কি? এবং cryosurgery চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে মোটামুটি একটি ধারণা পেয়েছেন।


Mehedi Hasan Shawon

আমি মেহেদী হাসান শাওন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে পড়াশুনা করছি। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিষয়ে জানতে ও জানাতে পছন্দ করি। লিখতে ভালোবাসি।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

sixteen − 7 =

error: Content is protected !!