কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের চোখের যত্ন নিয়ে একটু বেশি সচেতন হতে হয়। যারা দিনের অধিকাংশ সময় কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে কাজ করেন তাদের মধ্যে ৫০-৯০% কম্পিউটার ব্যবহারকারীর চোখ ব্যাথা সমস্যা দেখা দেয়। অফিসে বসে যারা কম্পিউটারে কাজ করেন এমনকি ছোট ছোট বাচ্চা যারা দীর্ঘসময় ট্যাব, কম্পিউটারে গেমস খেলে তাদেরও চোখে ব্যাথা, মাথা ব্যাথা সমস্যা দেখা দেয়।

যখন আমরা কম্পিউটার বা মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি তখন আমাদের চোখের মুভমেন্ট পেশীগুলোকে সবসময় এক্টিভ থাকতে হয়, বিরতিহীনভাবে কাজ করতে থাকলে চোখের পেশীগুলো ক্লান্ত হয়ে যায়।

যদিও চোখের স্ট্রেস বা ব্যাথা অস্বস্তিতে ফেলে দেয় তবে চোখের জন্য ক্ষতিকারক এমন কোন স্থায়ী সমস্যা নয়। তবে কিছু লক্ষণ সম্পর্কে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। আর্টিকেলটিতে আমরা সেসব লক্ষণ, চোখের উপর চাপ কমানো এবং কম্পিউটার ব্যবহাকারীদের চোখের যত্ন নিয়ে ১০টি এক্সপার্ট টিপস সম্পর্কে আলোচনা করবো।

কম্পিউটার ব্যবহারের কারণে চোখে চাপ পড়ার লক্ষণসমূহ

কয়েকটি নির্ধারনকারী লক্ষণ রয়েছে যেগুলো কম্পিউটার স্ক্রিনে কাজ করার জন্য চোখের স্ট্রেস বা চাপকে নির্দেশ করে। যদিও বিভিন্ন কারণেই এই সমস্যাগুলো দেকা দিতে পারে, তবে যদি আপনি নিচের ২-৩টি লক্ষণ দেখতে পান এবং আপনাকে অনেকসময় যাবৎ ডিজিটাল স্ক্রিনের সামন বসে থাকতে হয় তবে সেটি কম্পিউটার স্ট্রেইনের ( computer strain ) ইঙ্গিত দেয়।

চোখের শুষ্কতা :

একজন সাধারণ মানুষ সাধারণত প্রতি মিনেট ২০বার চোখের পলক ফেলেন অর্থাৎ ঘন্টায় ১২০০ বার। কিন্তু,ডিজিটাল স্ক্রিনে চোখ রাখলে প্রতি মিনিটে ৫-৮ বার চোখের পলক ফেলেন। চোখের পলক ফেলার সময় চোখের অশ্রুগন্থি সক্রিয় হয়ে একপ্রকার লবণাক্ত পদার্থ তৈরি করে, যা আামদের চোখকে ভিজিয়ে রাখে এবং শুষ্কতা থেকে রক্ষা করে।

ডিজিটাল স্ক্রিণে যেহেতু আমরা সাধারণ নিয়মের তুলনায় কম পলক ফেলি, তাই আস্তে আস্তে আমাদের চোখ শুকিয়ে যেতে থাকে। এই সমস্যা থেকে মেইবোমিয়ান গ্রন্থি কর্মহীনতা ( এমজিডি ) এর মতো দীর্ঘস্থায়ী অবস্থার কারণ হতে পারে। এমজিডি ( MGD ) কর্মহীন হয়ে পড়লে আপনার অফস্ক্রিন টাইমেও চোখ শুষ্কতা সমস্যায় ভুগতে পারে।

মাথাব্যাথা :

কয়েকঘন্টা একইভাবে বসে থেকে কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করলে মাথাব্যাথা হতে পারে। এই ধরনের মাথাব্যাথা সাধারণত মাথার পিছনের দিক বা ঘাড়ের উপরের দিক থেকে শুরু হয় এবং কপাল ও মাথার চারপাশে ব্যাথা তীব্র হয়ে ওঠে।

এধরনের মাথাব্যাথা মাইগ্রেণে পরিণত হতে পারে। প্রায়ই যারা এধরনের মাথাব্যাথার সম্মুখীন হচ্ছেন তাদের এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

চোখের ক্লান্তি :

ড্রাইভিং করার সময় কিংবা  পড়ার সময় আমরা সাধারণত খুব মনোযোগ দিয়ে সামনের বস্তু দেখি, মনোযোগী থাকলে আমাদের চোখ একটা সময় ক্লান্ত হয়ে যায়। অনস্ক্রিনে মনোনিবেশ করলে চোখের উপর আরো কয়েকগুণ বেশি চাপ পড়ে।

চারপাশের আলো না রেখে শুধু স্ক্রিন অন রাখলে আলোর সংবেদনশীলতা আরো বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় চোখের পেশীগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে। চোখের ক্লান্তি এক বা উভয় চোখেই দৃষ্টির অস্পস্টতা তৈরি করতে পারে।

কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের চোখের যত্ন

যদি আপনার চোখের কোন সমস্যা থাকে যেমন দীর্ঘদৃষ্টি বা স্বল্পদৃষ্টি এবং ডাক্তার আপনারকে লেন্স বা চশমা ব্যবহার করতে বলেছে, তবে আপনি অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলুন এবং নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা করে আপ টু ডেট নজর রাখার চেষ্টা করবেন।

চোখের যত্নে নিচের ১০টি টিপস ( eye care for computer user in bangla ) আপনার চোখের উপর চাপ কমাতে সাহায্য করবে।

১) চোখ হাইড্রেট রাখুন

চোখের লুব্রিকেটিং ড্রপ ব্যবহারের মাধ্যমে চোকের শুষ্কতা সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। সামান্য একটি ড্রপ আপনার চোখের বিভিন্ন সমস্যা থেকে দূরে রাখতে পারে এবং আপনার চোখের পেশীগুলোর ক্লান্তি দূর করে দিতে পারে। যদি লুব্রিকেটিং ড্রপ দিতে না চান, তবে প্রতি দুইঘন্টা পরপর চোখে ভালভাবে পানি দিন।

২) মাঝে মাঝে পানি পান করুন

ডিহাইড্রেশন চোখসহ পুরো দেহকে আক্রান্ত করতে পারে। একজন মানুষের প্রতিদিন কমপক্ষে গড়ে আট গ্লাস পানি পান করা উচিৎ, তবে দেহের আকার, পরিশ্রমের মাত্রার উপর নির্ভর করে আরো বেশি পান করার প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিদিন পর‌্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করলে চোখের শুষ্কতা সমস্য থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে।

৩) শুষ্ক বায়ু এড়িয়ে চলুন

দেহকে হাইড্রেট করার পাশাপাশি চারপাশের বায়ুর দিকেও নজর দেওয়া জরুরী। অফিসে ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনার এবং ভেন্টিলেটর ব্যবহার করা হয় যা ধুলা-ময়লা বাতাসে উড়তে সাহায্য করে। ডাস্ট আপনার অশ্রু গন্থিকে আক্রান্ত করে যার ফলে প্রায়শই চোখ জ্বালা করে।

নিজের কাজের জায়গার চারপাশ এবং ডেস্ক ডাস্ট ফ্রি রাখার চেষ্টা করুন। ফ্যান বা এসি যেন আপনার মুখের দিকে সরাসরি তাক করা না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন।

৪) ল্যাপটপ ব্যবহারে মাঝে বিরতি নিন

কাজের মাঝে বিরতি শুধু আপনার চোখ নয় বরং সারাদেহ-মন কেই প্রমান্তি এবং নতুন করে কাজ করার উদ্দ্যোম জোগায়। জরিপে দেখা গেছে, যারা কাজের মাঝে বিরতি নেয়, তারা চোখের উপর কম চাপ অনুভব করেন। কাজের মাঝে ছোট ছোট ব্রেক আপনার চোখের পাশাপশি ব্যাক পেইন থেকেও রক্ষা করতে পারে।

৫) কম্পিউটার ব্যবহারের সময় চোখের পলক ফেলুন

আমরা আলোচনার শুরুর দিকে জেনেছিলাম কম্পিউটার স্ক্রিনে আমরা অন্য সময়ের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ কম পরিমাণ চোখের পলক ফেলি, যা আমাদের চোখ শুষ্কতার অন্যতম প্রধান কারণ।

কাজ করার সময় আরো বেশি পলক ফেলার অভ্যাস করতে পারেন। কাজের চাপে অনেকসময় আমরা চইলেও করতে পারিনা, সেক্ষেত্রে কাজের মাঝে মাঝে ডেস্ক থেকে দূরে তাকিয়ে ১মিনিট সময় খুব দ্রুত চোখের পলক ফেলুন।

৬) স্বাস্থ্যসম্মত নাস্তা করুন

দুপুরের খাবার ছাড়াও চোখের রেটিনার কোষগুলোকে সক্রিয় রাখার জন্য হালকা নাস্তা করুন, বাদাম এবং ফলমূল খাওয়ার চেষ্টা করুন। বাদামে পাওয়া ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড চোখের  ‍শুষ্কতা থেকে রক্ষা করতে পারে। নাস্তা করতে বিরক্তবোধ করলে এ,সি, এবং ই যুক্ত সাপ্লিমেন্ট ভিটামিন ট্যাবলেট খেতে পারেন।

৭) নিয়মিত ঘুম

ঘুমের সময় আমাদের চোখ পুষ্টি সংগ্রহ করে এবং অশ্রু তৈরি করার সময় পায়। স্বাস্থ্যকর চোখের জন্য নিয়মিত এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। ঘুমের ব্যাঘাত হলে আামাদের চোখের রক্তনালীগুলোতে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে এবং ফলশ্রুতিতে চোখে জ্বালাপোড়া এবং ক্লান্তির সৃষ্টি করে।

যারা সারাদিন অফিসে কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে কাজ করে, সন্ধ্যায় মোবাইল বা টিভি থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন, এসবের পরিবর্তে রান্নার মতো পরিশ্রমের কাজ করতে পারেন।

৮) কম্পিউটার রাইট সেট-আপ

কম্পিউটারে ছোট জিনিস দেখতে যে পরিমাণ চোখে চাপ দিতে হয়, বড় জিনিস দেখতে তারচেয়ে কম পরিমাণ পরিশ্রমের প্রয়োজন। কম্পিউটার ফন্ট সাইজ পরিবর্তন করে চোখের পরিশ্রম কিছুটা কমানো যায়। তাছাড়া বড় স্ক্রিণ ব্যবহার করলেও চোখের জন্য কিছুটা সুবিধা হবে। নিচে আরো ২টি পরিবর্তন নিয়ে বলবো যেগুলোর জন্য নতুন জিনিস ক্রয় করে টাকা খরচের দরকার নেই।

৯) Computer স্ক্রিন পজিশন :

পিউটার স্ক্রিনের সঠিক অবস্থান এবং কোন আপনার চোখ এবং ঘাড়ের জন্য জরুরী। কম্পিউটার স্ক্রিন আপনার মুখ তেকে কমপক্ষে ২০ ইঞ্চি দূরে রাখুন তবে ৪০ ইঞ্চির বেশি নয়। উচ্চতা সেটআপ করতে পারলে চোখ বরাবর ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি নিচে নামিয়ে রাখুন। তাহলে আপনাকে বারবার নিচে বা উপরে ঝুকতে হবেনা। আপনার ঘাড় এবং চোখ স্ট্রেস তেকে রক্ষা পাবে।

১০) কম্পিউটারে Eye Saver ব্যবহার করুন :

যারা রাতে কাজ করেন তাদের জন্য এই টিপসটি তাদের জন্য। যদি কিন্ডেলের সাথে থাকে পরিচিত হয়ে থাকেন তবে নিশ্চয়ই জানেন, চোখের জন্য কমফোর্টেবল ব্রাইটনেস এবং কালার এডজাস্ট করা সম্ভব, মোবাইলের ডার্ক মোডও আমাদের বেশ ভাল কমফোর্ট ব্রাউজিং এক্সপেরিয়েন্স দেয়। ঠিক একই রকম এবং তারচেয়ে বেশি সার্ভিস পাবেন Eye Saver সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে। স্ক্রিন কে ৮টি কালার মোড দেওয়া যায়, যার মধ্যে সাদা (রিডিং ১) এবং ডার্ক মোড (রিডিং ২) খুব কার্যকরী।

ডাউনলোড

শেষকথা:

চোখের সমস্যা মারাত্মক অস্বস্তিদায়ক এবং যন্ত্রণাময়। আপনি কোন এক্সট্রা খরচ না করেই উপরের কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের চোখের যত্ন বিষয়ক এক্সপার্ট টিপসগুলো অনুসরণ করে স্বস্তি পেতে পারেন।

উপরের চোখের যত্নে টিপসগুলো ( eye care tips ) অনুসরণ করার পরেও যদি কম্পিউটার ব্যবহার করার কারণে চোখের সমস্যা দেখা দেয় তবে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন।


Abdullah

বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদে অধ্যয়নরত। জানার আগ্রহ থেকে whyorwhen এবং Pratiborton এ লেখালেখি করি।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

twenty + thirteen =

error: Content is protected !!